‘মূল্যস্ফীতি’ শব্দটি শুনলেই সাধারণ মানুষের মনের পর্দায় ভেসে ওঠে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চড়া দামের এক দুঃসহ চিত্র। বাজার করতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হয়ে যাওয়ার বেদনা এবং পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়ার চিরন্তন সংগ্রাম প্রতিটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। অর্থনীতির পরিভাষায় মূল্যস্ফীতি কেবল একটি সূচক বা সংখ্যা নয়, এটি হলো কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান খর্বকারী এক নির্মম বাস্তবতার নাম, যা সমাজের গভীরে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি করে।
বর্তমান সময়ে দেশের সার্বিক অর্থনীতি এক বহুমুখী মন্দাবস্থা এবং মূল্যস্ফীতির অসহনীয় চাপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বাজারের প্রতিটি পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ গিলে খাচ্ছে, অথচ সে তুলনায় মানুষের আয় বা মজুরি বাড়েনি। ব্যবসার গতি মন্থর হয়ে পড়া, মানুষের সঞ্চয় ভেঙে খাওয়ার প্রবণতা এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা সব মিলিয়ে পুরো অর্থনীতি এক গভীর ও শ্বাসরুদ্ধকর অচলাবস্থার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপ ও সার্বিক অর্থনীতির চলমান মন্দাবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নতুন যে ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এই মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তা উল্টো মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যাওয়ার নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। মুদ্রানীতির এই কৌশলী অবস্থান বাজার ব্যবস্থায় কতটা স্বস্তি আনবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।
ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য প্রতিনিয়ত সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে সামান্য ঊর্ধ্বগতি দেখা দিলেই তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির এই শৃঙ্খল প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা মূল্যস্ফীতির আগুনকে আরও বেশি দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে তোলে।
অর্থনীতির বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল চালুর বিষয়টি বাজারে নতুন করে অর্থপ্রবাহ বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ইতিমধ্যে নাগালের বাইরে চলে গেছে, তখন সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি সাময়িকভাবে তাদের স্বস্তি দিলেও সামগ্রিক বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। মুদ্রানীতিতে এই অভ্যন্তরীণ চাহিদার চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই।
বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথে পণ্য সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এই আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল এবং বিভিন্ন আমদানীকৃত কাঁচামালের শিপিং খরচ ও সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতা সরাসরি আমাদের দেশের আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিচ্ছে।
একটি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে তার উৎপাদন খাত, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের চাকা সচল থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, অর্থনীতির এই মূল চালিকাশক্তিগুলো এখনো আশানুরূপ গতি ফিরে পায়নি। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং আমদানির জটিলতার কারণে শিল্পকারখানাগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথকে মারাত্মকভাবে শ্লথ করে দিচ্ছে।
দেশের কারখানগুলোতে একদিকে কাঁচামাল আমদানির সংকটজনিত উৎপাদন স্থবিরতা এবং অন্যদিকে গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে বাজারে চাহিদা হ্রাসের ঘটনা ঘটছে। এই দ্বিমুখী সংকটের যাঁতাকলে পড়ে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। উৎপাদন খাতের এই দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা কেবল বেকারত্ব বাড়িয়েই দিচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতে বাজারে পণ্যের তীব্র সংকট সৃষ্টি করে মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বহুলাংশে বাড়িয়ে তুলবে।
অব্যাহত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এবং উৎপাদন খাতের এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার দ্বিমুখী সংকটে পড়ে দেশের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থা আজ এক চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছে। একপাশে মানুষের পকেটে টাকা নেই বা আয় কমে গেছে, অন্যপাশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েই চলেছে। এই অদ্ভুত ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির কারণে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পর্যন্ত প্রত্যেকেই এক গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্য দিয়ে তাদের দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করছেন।
ব্যবসায়িক পরিবেশের অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাংকগুলো থেকে নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ব্যবসায়ীদের মধ্যে একেবারেই কমে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার মূল হাতিয়ার হলো এই বেসরকারি খাত, অথচ আস্থার সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা কোনো নতুন বড় ঝুঁকিতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নীতিনির্ধারকদের সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ও জটিল চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সাথে অর্থনীতির স্থবির প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখা। মুদ্রানীতিতে সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও প্রবৃদ্ধি থমকে যায়, আবার প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর নীতি নিলে মুদ্রাস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে পড়ে। এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা বা ‘ফাইন-টিউনিং’ করা বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য এক বিরাট পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি দমনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি এবং বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমানোর মতো কিছু কঠোর সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করেছে। তত্ত্বের দিক থেকে এটি কার্যকর মনে হলেও, এর ফলে ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ব্যবসা ও উৎপাদন খাত আরও বেশি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ ওষুধ দিতে গিয়ে রোগীর অন্য অঙ্গে জটিলতা দেখা দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে মুদ্রানীতির এই কড়াকড়ি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর চেয়ে ব্যবসাকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দেশীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং এক শ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কেবলমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি পরিবর্তন করে বা সুদের হার বাড়িয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি চিরতরে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, যদি না অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী কাঠামোগত সংস্কার আনা হয়।
রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দুর্নীতি দমন, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা এবং বিনিয়োগের জন্য অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি না করলে যেকোনো মুদ্রানীতি কাগজে-কলমে সফল হলেও মাঠপর্যায়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হবে। নীতিনির্ধারকদের এই মৌলিক সত্যটি অনুধাবন করার সময় এখনই।
লেখক: কলামিস্ট
কেকে/সাশ