ভারত ও তুরস্কের সম্পর্ক একটি বহুমাত্রিক ও পরস্পরবিরোধী ক্ষেত্র, যেখানে ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি এবং সমসাময়িক ভূরাজনীতি এক অদ্ভুত মারপ্যাঁচে জড়িয়ে আছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির পেছনে কাজ করছে ‘কৌশলগত গভীরতা’, ‘ব্লু হোমল্যান্ড’, প্যান-ইসলামবাদ এবং নব্য-উসমানীয় ভাবনা। তুরস্ক নিজেকে যেমন ইউরোপের একটি দেশ বা ন্যাটোর সদস্য হিসেবে দেখে; তেমনি ইতিহাস ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার উচ্চাকাক্সক্ষাও লালন করে। তবে ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো পাকিস্তান। পাকিস্তান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা ভারত-তুরস্ক সম্পর্ককে সীমিত করে রেখেছে।
ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের ইতিহাস আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্মেরও বহু পুরোনো। ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে উসমানীয় সাম্রাজ্যের যোগাযোগ ছিল বাণিজ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি ও কূটনীতির নানা স্তরে। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে ১৯১২ সালের প্রথম বলকান যুদ্ধের সময় ভারতীয় মুসলিম সমাজের উদ্যোগে ডা. মুখতার আহমেদ আনসারির নেতৃত্বে একটি চিকিৎসা মিশন তুরস্কে পাঠানো হয়। আহত উসমানীয় সেনাদের চিকিৎসায় সহায়তার জন্য প্রেরিত এই মিশনটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে তুরস্কের প্রতি সহমর্মিতার এক অনন্য নিদর্শন।
পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের প্রতি ব্রিটিশ নীতির বিরোধিতা করেছিল ভারতীয় মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ। খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গে তুরস্কের প্রশ্নটি গভীরভাবে যুক্ত ছিল এবং মহাত্মা গান্ধীও এতে সমর্থন জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের শুরুতে ছিল একধরনের ঐতিহাসিক সহমর্মিতা। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব বদলে যায়।
শীতল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয় এবং তুরস্কও ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল। ফলে সম্পর্কের ওপর পাকিস্তান-ফ্যাক্টর ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কাশ্মীর প্রশ্ন এই দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে। ভারত কাশ্মীরকে নিজের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ের অংশ হিসেবে দেখে, কিন্তু তুরস্ক কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এভাবে ঐতিহাসিক যোগাযোগের সঙ্গে নতুন ভূরাজনীতির সংঘাত শুরু হয়।
এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে আরও সক্রিয় ও বহুমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ভারতও সেই কৌশলগত ভাবনার বাইরে নয়। রাজনৈতিক সম্পর্কের পারদ ওঠানামা করলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তবে ২০১৯ সালে ভারত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করার পর সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্য হয়। এরদোয়ান ভারতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন এবং কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান। দিল্লি এতে অসন্তুষ্ট হয়, কারণ ভারতের দৃষ্টিতে এটি ছিল অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং দ্বিপক্ষীয় বিরোধকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নেওয়ার চেষ্টা। এরপরেও দুই দেশ কূটনৈতিক দরজার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে প্রায় সব সময় একটি তৃতীয় দেশ হিসেবে পাকিস্তান উপস্থিত থাকে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক মিত্রতার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। সামরিক সরঞ্জাম, যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ ভারতের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলেরের পাকিস্তান সফর এবং সেখানে প্রতিরক্ষা শিল্প ও ড্রোন সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা দিল্লির নিরাপত্তা ভাবনায় প্রভাব ফেলে। আঙ্কারা যত ইসলামাবাদের কাছে যায়, দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ওপর তত চাপ তৈরি হয়।
২০২৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত এই টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করে। ওই বছরের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরে এক হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা দ্রুত বাড়ে এবং ৭ মে ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান চালায়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে সংঘাত হয়। সংঘাতের সময় তুরস্ক পাকিস্তানের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানায়, যার ফলে অপারেশন সিন্দুরের পর ভারত-তুরস্ক সম্পর্ক একপর্যায়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
সংঘাতে ব্যবহৃত ড্রোন নিয়ে তুরস্কের ভূমিকা আলোচনায় এলেও সব ড্রোন তুরস্কের তৈরি ছিল না; পাকিস্তানের নিজস্ব ও অন্যান্য দেশের তৈরি ড্রোনও সেখানে ব্যবহৃত হয়। তবে তুরস্কের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ছিল বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সম্পর্কের অংশ, যা কৌশলগত টানাপোড়েনের প্রতীক হয়ে ওঠে। তবুও ভারতের জন্য তুরস্কের গুরুত্ব ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তুরস্ক কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, মধ্যপ্রাচ্য, বলকান ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর কৃষ্ণসাগরের গুরুত্ব বেড়েছে, আবার আজারবাইজানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতার বিপরীতে ভারত আর্মেনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তুলেছে। এগুলো সরাসরি তুরস্কবিরোধী জোট না হলেও ভারতের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ভারত মধ্য এশিয়ায় নিজস্ব উপস্থিতি ও ইউরোপের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যপথ চায়, যার জন্য তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ এক দরজা।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পর্যটন পুরোপুরি থেমে যায়নি। ভারতের বিশাল বাজার তুরস্কের জন্য যেমন একটি বড় সুযোগ, তেমনি ইউরোপ-এশিয়া সংযোগের সম্ভাব্য সেতু হিসেবে তুরস্কও ভারতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনীতি রাজনীতির বিকল্প না হলেও এটি সম্পর্কের একটি ন্যূনতম ভিত্তি ধরে রাখে। ভারতের জন্য তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ন্যাটোর সদস্য, ইউরোপ-এশিয়ার সংযোগস্থল এবং মধ্য এশিয়া ও ককেশাসে সক্রিয় এক রাজনৈতিক শক্তি। উপরন্তু, সম্পর্ক পুরোপুরি খারাপ হলে পাকিস্তান নিয়ে আঙ্কারার নীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ ভারত হারাতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতি হিসেবে ভারতের বিশাল বাজার ও কৌশলগত অবস্থানকে উপেক্ষা করা তুরস্কের জন্যও সহজ নয়। এই বৈশ্বিক বাস্তবতাই ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে দুই দেশকে পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের ১২তম আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে, যেখানে ভারতের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পশ্চিম) সিবি জর্জ এবং তুরস্কের পক্ষে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিনজি নেতৃত্ব দেন। সংবেদনশীল পরিবেশের মধ্যেও এই আলোচনায় বসা স্পষ্ট করে যে, উভয় দেশই সব দরজা বন্ধ না করার নীতিতে বিশ্বাসী।
তবে এই ইতিবাচক কূটনৈতিক পদক্ষেপের পরপরই ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া এই চুক্তিতে বলা হয়, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা বাকি তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। একইসঙ্গে এটি যৌথ প্রতিরোধক্ষমতা জোরদারের কথা বলে।
ভারতের জন্য এটি উদ্বেগজনক, কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামোর রূপ নিয়েছে এবং সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্তির ফলে এর ভৌগোলিক পরিসর আরও বড় হয়েছে। যদিও চুক্তিটিকে সরাসরি ভারতবিরোধী জোট বলা কঠিন এবং তুরস্ক এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার যৌথ কাঠামো হিসেবে দেখিয়েছে, তবুও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের এই সামরিক ঘনিষ্ঠতা ভারত-তুরস্ক সম্পর্ককে পাকিস্তান-ফ্যাক্টর থেকে আলাদা রাখার দিল্লির চেষ্টা বহুগুণ কঠিন করে তুলবে। ২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহে এই অদ্ভুত বৈপরীত্যই স্পষ্ট—এপ্রিলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ইতিবাচক বার্তা, আবার আগস্টে নতুন নিরাপত্তা জোটে প্রবেশ।
লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট
কেকে/এআই