রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬,
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক ডাকলেন তারেক রহমান      ● রিয়াদে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় বাংলাদেশের নিন্দা      ● আইপিইউতে বাংলাদেশ নিয়ে ভুল ধারণা কেটেছে : স্পিকার      ● বিক্ষোভে টলছে মোদির গদি      ● রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২, আহত ৩০৯      ● বিক্ষোভ থেকে আটক অভিনেতা ইমরান খান      ● আবুধাবি টেস্ট : স্বস্তিতে দিন শেষ আফগানিস্তানের      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
শামুক নিধনে বিপন্ন জলাভূমি
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

আমাদের শৈশবের বাংলার সঙ্গে আজকের বাংলার একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। একসময় হাওর, বিল ও নদী ছিল জীবনের এক জীবন্ত পাঠশালা। বর্ষার নতুন পানিতে বিল কানায় কানায় ভরে উঠত, ফুটে থাকত শাপলা-শালুক। স্বচ্ছ পানির নিচে ধীরে ধীরে চলাফেরা করত অসংখ্য শামুক ও ঝিনুক, আর তাদের আশ্রয়ে বেড়ে উঠত দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। শীত এলেই হাজার হাজার অতিথি পাখির ডানায় মুখর হয়ে উঠত জলাভূমি। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন একে অপরের সঙ্গে অদৃশ্য বন্ধনে যুক্ত ছিল। এ ছিল স্রষ্টার সৃষ্টি করা এক অনন্য ভারসাম্য।

কিন্তু সেই চেনা জলাভূমির চিত্র আজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাওর, বিল ও নদী থেকে প্রতিদিন নির্বিচারে শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোথাও হাঁসের খাদ্য, কোথাও মাছের খামার, কোথাও আবার চুন তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বস্তায় বস্তায় তুলে নেওয়া হচ্ছে দেশীয় শামুক। একইসঙ্গে শাপলা, শালুক ও দেশীয় ছোট মাছও নির্বিচারে আহরণ করা হচ্ছে। প্রজননের সুযোগ না দিয়েই জলাভূমির এই প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। সাময়িক লাভের এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জলজ পরিবেশকে ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অনেকের কাছেই শামুক তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রাণী নয়। অথচ পরিবেশবিজ্ঞান বলছে, শামুক জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা পানির জৈব ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে, তলদেশের পরিবেশকে সচল রাখতে সহায়তা করে এবং অসংখ্য মাছ, কচ্ছপ ও পরিযায়ী পাখির খাদ্যচক্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ শামুক কমে গেলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

আজ আমাদের জলাভূমি একাধিক সংকটের মুখোমুখি। নদী ভরাট, শিল্পবর্জ্যে দূষণ, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অবৈধ দখলের পাশাপাশি নির্বিচারে শামুক নিধন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, অতিথি পাখির খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই একটি ছোট প্রাণীর বিলুপ্তিও শেষ পর্যন্ত পুরো পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে।

বিশ্বখ্যাত পরিবেশবিদ র‌্যাচেল কারসন তার ঝরষবহঃ ঝঢ়ৎরহম গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রকৃতির কোনো উপাদানই বিচ্ছিন্ন নয়; একটি অংশের ক্ষতি ধীরে ধীরে পুরো পরিবেশব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আজ আমাদের জলাভূমির বাস্তবতা সেই সতর্কবার্তাকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

ইসলামও মানুষকে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিক্ষা দিয়েছে। মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়; আল্লাহর দেওয়া এই পৃথিবীর একজন আমানতদার। তাই প্রকৃতিকে ধ্বংস করা কিংবা জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট করা ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্বশীলতার পরিপন্থি।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— ‘তাঁর কাছে প্রতিটি বস্তুরই একটি নির্ধারিত পরিমাণ ও ভারসাম্য রয়েছে।’ (সূরা আর-রা’দ : ৮)

অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে খাও ও পান কর; কিন্তু পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িও না।’ (সূরা আল-বাকারা : ৬০)

এ আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা বৈধ, কিন্তু তা এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না, যাতে প্রকৃতির পুনরুৎপাদনের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। জীবিকার প্রয়োজনে নদী বা বিল থেকে সম্পদ আহরণ করা স্বাভাবিক; কিন্তু সেই আহরণ যদি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, তবে তা নৈতিক ও পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শামুকের প্রজনন মৌসুমে আহরণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ, জলাভূমিতে নিয়মিত নজরদারি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে যে, শামুক রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং দেশীয় মাছ, অতিথি পাখি, জলাভূমি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তাকে রক্ষা করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতাদেরও এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। মসজিদের খুতবা, সামাজিক প্রচারণা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি গড়ে তুলতে হবে যে, প্রকৃতি সংরক্ষণ কেবল পরিবেশগত দায়িত্ব নয়; এটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও।

একটি শামুক হয়তো খুব ছোট প্রাণী। কিন্তু প্রকৃতির বিশাল ব্যবস্থায় তার অবদান মোটেও ছোট নয়। কোটি কোটি শামুক হারিয়ে গেলে বিল হারায় তার স্বচ্ছতা, মাছ হারায় তার নিরাপদ আবাস, পাখি হারায় তার খাদ্য, আর মানুষ হারায় তার ভবিষ্যৎ।

তাই আজ শামুক রক্ষা মানে শুধু একটি প্রজাতিকে রক্ষা করা নয়; শামুক রক্ষা মানে আমাদের জলাভূমি রক্ষা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বাংলাদেশের পরিবেশগত ভবিষ্যৎ রক্ষা। আমাদের হাওর, বিল ও নদীগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাক, শাপলা-শালুকে ভরে উঠুক জলরাশি, ফিরে আসুক দেশীয় মাছ ও অতিথি পাখির কোলাহল। কারণ জলাভূমি বাঁচলে বাঁচবে প্রকৃতি, আর প্রকৃতি বাঁচলেই নিরাপদ থাকবে মানুষের ভবিষ্যৎ।

লেখক : কৃষি উদ্যোক্তা

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  শামুক   নিধন   বিপন্ন   জলাভূমি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close