ক্যারিবীয় সাগরে যুদ্ধজাহাজের সারি দেখে গত বছরের শেষদিকে বিশ্লেষকরা একটাই প্রশ্ন করছিলেন, হামলা কি হবে? ৩ জানুয়ারি ২০২৬ সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। কিন্তু উত্তরটা এসেছে অপ্রত্যাশিত চেহারায়। কারাকাস দখল হয়নি, বিমানঘাঁটিতে মার্কিন পতাকা ওড়েনি। এক রাতের অভিযানে একজন রাষ্ট্রপতি আর তার স্ত্রী নিউইয়র্কের হাজতে পৌঁছে গেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র রয়ে গেছে আগের জায়গায়, শুধু চালকের আসনে নতুন মুখ। নয় মাস পর দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা তাই বদলে গেছে। ‘আক্রমণ হবে কি না’ এখন আর জরুরি নয়। জরুরি হলো, এই নতুন মডেলের হিসাবের খাতায় কার নামে কী জমা পড়ছে, আর কে দিচ্ছে খরচ। অভিযানের আগে ছিল চার মাসের ধারাবাহিক চাপ।
২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রথম নৌকা- হামলায় এগারোজন নিহত হন বলে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন। জানুয়ারির আগেই সেপ্টেম্বর থেকে মাদকবাহী সন্দেহে দক্ষিণ আমেরিকার জলসীমায় অন্তত ৩৫টি হামলায় কমপক্ষে ১১৫ জন নিহত হয়েছিলেন। এই সংখ্যাগুলো আসছে খোদ প্রশাসনের ঘোষণা থেকে। কোনো স্বাধীন আদালত বা তদন্ত সংস্থা এখনো এগুলোর আইনি ভিত্তি যাচাই করেনি। তারপর ৩ জানুয়ারির অভিযান।
ওয়াশিংটন বলছে, মাদক-সন্ত্রাসের পুরোনো অভিযোগে অভিযুক্ত মাদুরো আর তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ধরা হয়েছে। সেইসঙ্গে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘নিরাপদ ও বিবেচনাপূর্ণ’ ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত দেশটিকে চালাবে। সিএফআর-এর বিশ্লেষকরা তখনই সতর্ক করেছিলেন যে, বাইরে থেকে দেশ চালানোর এই ধারণা ইরাক-ধাঁচের বিপর্যয়ের রেসিপি হতে পারে।
ইরাকের উল্টো মডেল
বাস্তবে ইরাকের চেয়ে উল্টো কিছু ঘটেছে, আর এটাই এই পর্বের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক। ২০০৩ সালে বাগদাদে পুরো রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে ফেলা হয়েছিল। কারাকাসে ভাঙা হয়েছে শুধু শীর্ষ পদটি। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ, যিনি মাদুরোর ঘনিষ্ঠতম সহযোগী, শপথ নিয়েছেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে। প্রথমে তিনি অভিযানকে ‘পাশবিক আগ্রাসন’ বলেছিলেন, পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখান। এখন ট্রাম্প প্রশাসন তার সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। অর্থাৎ লক্ষ্য ছিল ব্যক্তি, ব্যবস্থা নয়।
শাসন পরিবর্তন নয়, বরং শাসন ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন। যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এত গর্জন, সেই ব্যবস্থার ভেতরের মানুষটিকেই ওয়াশিংটন এখন কাজের সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেছে। গণতন্ত্রের প্রশ্নটি তাই আপাতত ঝুলে আছে। ট্রাম্প নিজেই ৩০ দিনের মধ্যে ভোটের সময়সীমাকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর যুক্তরাষ্ট্র রদ্রিগেজকে নির্বাচিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে’ পৌঁছানোর কথা বলছে, অথচ জাতীয় পরিষদের প্রধান জর্জ রদ্রিগেজ কাছাকাছি সময়ে নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। স্বীকৃতি না দিয়েও কাজ চালানো, এটাই এই মডেলের বৈশিষ্ট্য।
তেলের হিসাব যা মেলে না
সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা ‘সবই তেলের জন্য’। দেশটির মজুত বিশ্বে সর্বোচ্চ, এটা সত্যি। কিন্তু সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে তেলের গল্প ততটা সরল থাকে না। ১৯৯৯ সালে শাভেজ ক্ষমতায় আসার সময় দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল। কেপলারের হিসাবে এখন তা প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল, যা বিশ্ব সরবরাহের ১ শতাংশেরও কম। একই প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস হলো, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ উৎপাদন ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে। গভীর সংস্কার আর বড় বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া ২০ লাখের ওপরে ওঠা অসম্ভব।
সোজা কথা, ভেনেজুয়েলার তেল আগামী কয়েক বছরে বিশ্ববাজারের দাম নাড়াতে পারবে না। এর মূল্য দীর্ঘমেয়াদি: মজুতের ওপর নিয়ন্ত্রণ, মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার, এবং চীন-রাশিয়ার হাতে যাওয়ার পথ বন্ধ করা। এই শেষ লক্ষ্যের ইঙ্গিত মিলেছে আরেক জায়গায়। প্রশাসন অন্তর্বর্তী সরকারকে চীন, রাশিয়া, কিউবা ও ইরানের সন্দেহভাজন গুপ্তচর ও গোয়েন্দা কর্মীদের বহিষ্কার করতে চাপ দিয়েছে। এটা তেলের চেয়ে ভূ-রাজনীতির হিসাব বেশি। আরেকটি পরোক্ষ ফল কিউবা।
ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেলের আয় হারিয়ে কিউবা এখন পড়ে যাওয়ার মুখে, তাই সেখানে সামরিক পদক্ষেপ দরকার হবে না। এক রাজধানীর অভিযান তাই আরেক রাজধানীর অর্থনীতি শুকিয়ে দেওয়ার হাতিয়ারও বটে।
অভিযানের নৈতিক ভিত্তি ছিল মাদক ও অপরাধ দমন। এখানেই তথ্য আর ঘোষণার মধ্যে ফাঁক সবচেয়ে বড়। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মাদুরো ভয়ংকর ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’ গ্যাংকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন। আল জাজিরার ফ্যাক্টচেকে বলা হয়েছে, এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, অভিযোগপত্রেও এই দাবির উল্লেখ নেই। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও বলা হয়েছিল, মাদুরো সরকার সম্ভবত গ্যাংটির যুক্তরাষ্ট্রমুখী তৎপরতা পরিচালনা করে না।
আদালত এখন এ প্রশ্নের সামনে। নিউইয়র্কের বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন ২০২৭ সালের ১ জুন বিচার শুরুর সম্ভাব্য তারিখ ঠিক করেছেন, তবে তার আগে বিচার হবে প্রতিরক্ষার মূল যুক্তির, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মাদুরো দম্পতির দায়মুক্তি আছে কি না। মামলাটি মাদক ষড়যন্ত্রের, ভোটে কারচুপির নয়। ফলে আদালতের রায় শুধু একজন অভিযুক্তের ভাগ্য ঠিক করবে না। এক দেশের সেনাবাহিনী অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে আনার নজির আন্তর্জাতিক আইনে কোথায় দাঁড়াবে, সেটাও নির্ধারণ করবে।
কাঠামোগত আলোচনায় হারিয়ে যায় সেই মানুষেরা, যাদের জীবন সরাসরি জড়িত। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে খবর এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিরোধীদের দ্বিতীয় দফা আলোচনার পর ৩৯ জন রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি পেয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন ফোরো পেনাল জানাচ্ছে, ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৪৪ জন রাজনৈতিক বন্দি রয়ে গেছেন, ১০ আগস্টে যা ছিল ৩৯১। ওই সময় সরকার ১৩১ জনকে ‘বিকল্প ব্যবস্থায়’ ছাড়ার দাবি করেছিল।
সংখ্যা কমছে, কিন্তু কারাগার এখনো খালি হয়নি। মুক্তি এসেছে কিস্তিতে, দর-কষাকষির টেবিলে, ওয়াশিংটনের অনুমোদনের ছায়ায়। এর মূল্য অস্বীকার করা যায় না, কারণ প্রতিটি নাম একটি পরিবারের স্বস্তি। তবু যে মুক্তি অধিকার হিসেবে নয়, দর-কষাকষির ফল হিসেবে আসে, সেটি স্থায়ী গণতন্ত্রের ভিত নয়।এর ওপর যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির আঘাত। জুনে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৫,২৭৮ জন মারা গেছেন। রাজনৈতিক অচলাবস্থা আর মানবিক বিপর্যয় একসঙ্গে সামলানোর মতো কাঠামো দেশটির হাতে নেই।
ডকট্রিনের বংশলতিকা
এই সবকিছুর আদর্শিক ছাতা মনরো ডকট্রিন। ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা করেছিলেন, ইউরোপীয় শক্তিগুলো আর আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ গড়তে পারবে না; স্বাধীনতাকামী লাতিন আমেরিকার অনেক নেতা তখন একে স্বাগতই জানিয়েছিলেন। মূলত ছিল আত্মরক্ষামূলক বার্তা। ১৯০৪ সালে থিওডোর রুজভেল্ট এতে যে অনুসিদ্ধান্ত যোগ করেন, তা হস্তক্ষেপের অধিকারকেই বৈধতা দিয়েছিল। ঠান্ডাযুদ্ধে তার সঙ্গে জুড়েছিল কমিউনিজম ঠেকানোর যুক্তি।
২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে যুক্ত হয় ‘ট্রাম্প করোলারি’। ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা করেন, মনরো ডকট্রিন ‘পূর্ণ কার্যকারিতায় ফিরে এসেছে’। নতুন নামটি ‘ডনরো ডকট্রিন’। আগের করোলারিগুলোর সঙ্গে এর একটা পার্থক্য আছে। রুজভেল্ট ও ঠান্ডাযুদ্ধের যুগে হস্তক্ষেপের যুক্তি দাঁড়িয়েছিল একটি বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘিরে। এবার যুক্তির কেন্দ্রে আছে মাদক, অভিবাসন আর চীনের প্রভাবের মতো বিস্তৃত ও ঢিলেঢালা শব্দ। যে শব্দের সংজ্ঞা যত অস্পষ্ট, তার আওতা তত প্রসারিত।
ভেনেজুয়েলার পর কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, এমনকি গ্রিনল্যান্ডের নামও উঠেছে ট্রাম্পের বক্তব্যে। আইনসভায় দ্বিদলীয় আপত্তিও দেখা গেছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে অভূতপূর্ব যৌথ বিবৃতি দিয়েছে, আর ইউরোপে প্রশ্ন উঠেছে, আটলান্টিক জোট কি আদৌ অটুট আছে।
ঢাকা থেকে ক্যারিবীয় সাগর অনেক দূর। তবু নজিরের রাজনীতিতে ভৌগোলিক দূরত্ব খুব একটা কাজ করে না। আজ যদি ‘মাদক-সন্ত্রাস’ তকমা জাতিসংঘের অনুমোদনের বিকল্প হয়ে ওঠে, কাল অন্য কোনো শক্তি ‘নিজস্ব প্রভাববলয়ে’ অন্য কোনো তকমায় একই যুক্তি ব্যবহার করবে। বৃহৎ শক্তির যুক্তি একবার বৈধতা পেলে তা সবাই ধার করতে পারে। ইউক্রেন আর ভেনেজুয়েলা, দুই ক্ষেত্রেই মধ্যম ও ছোট রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকদের হাতে এই একই প্রশ্ন।
বাংলাদেশের মতো ৩য় বিশ্বের জন্য এখান থেকে কতগুলো বাস্তব শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ বৈধতাই প্রথম প্রতিরক্ষা। মাদুরোর সরকার ভেতর থেকে যত ফাঁপা হয়েছিল, বাইরের চাপ তত সহজ হয়েছে। জনসমর্থন ও নির্বাচনি বৈধতার ঘাটতি যে কোনো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই দরকারি, কোনো একটি শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা দর-কষাকষির জায়গা কমায়।
রপ্তানি বাজার, জ্বালানি সরবরাহ ও কূটনৈতিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য এক ধরনের বিমা। সবশষে আসে বহুপাক্ষিক মঞ্চে সক্রিয়তা। আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বল হওয়ার প্রথম ক্ষতি হয় ছোট রাষ্ট্রের। জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক ফোরামে নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেওয়া তাই আদর্শের বিলাসিতা নয়, স্বার্থেরই অংশ।
ভেনেজুয়েলার গল্প এখানেই শেষ নয়। আগামী কয়েক মাসে তিনটি পরীক্ষা আসল চিত্র স্পষ্ট করবে।
প্রথম পরীক্ষা নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকার কি নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করবে, নাকি ‘স্থিতিশীলতা’র অজুহাতে অনির্দিষ্টকাল ঠেলে দেবে? ওয়াশিংটন যদি স্বীকৃতি ছাড়াই সহযোগিতা চালিয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের কথাটা কেবল বক্তৃতার অলংকার হয়ে থাকবে।
দ্বিতীয় পরীক্ষা আদালত। ২০২৭ সালের জুনের বিচারের আগে দায়মুক্তি-বিতর্কের রায় জানাবে, রাষ্ট্রপ্রধানকে বিদেশি সেনার হাতে তুলে আনা আইনের চোখে কতটা বৈধ। যে রায়ই আসুক, তা নজির হয়ে থাকবে।
তৃতীয় পরীক্ষা তেলের স্বচ্ছতা। বিনিয়োগ কার হাতে যাচ্ছে, লাভ কার ঘরে উঠছে, আর সেই আয় কি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও কারাগারে আটকে থাকা মানুষের কাজে লাগছে? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে, ভেনেজুয়েলার সম্পদ জনগণের হলো, নাকি হাতবদল হলো শুধু।
মনরো ডকট্রিনের দুশো বছরের ইতিহাস থেকে আমরা বুঝতে পারি শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে নীতি বানায়, আর তার নাম দেয় নিরাপত্তা, স্থিতি বা মুক্তি। সেই নামের আড়ালে হিসাবের খাতাটা কেউ খুলে দেখলে তবেই বোঝা যায়, কে কী পেল আর কে কী হারাল। এই সম্পাদকীয়ের দাবি একটাই : সে খাতা খোলা থাকুক, আর ভেনেজুয়েলার মানুষ যেন শুধু পাতার সংখ্যা না হয়ে থাকেন।
লেখক : শিক্ষার্থী, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
কেকে/সাশ