সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু      ● ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী       ● গণবিক্ষোভে অস্থির ফ্রান্স, গ্রেপ্তার ২৪০০—ম্যাক্রোঁর কঠোর বার্তা      ● দুপুরে পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন ইশরাক      ● আজ মহাঅষ্টমী: কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজায় মুখর দুর্গোৎসব      ● মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      ● আগারগাঁওয়ে যাচ্ছে সচিবালয়, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
রিসোর্টে আগুন : কাঠামোগত হত্যার শিকার পর্যটকরা
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩১ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

শনিবার (১৭ অক্টোবর) কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ করেই এই আগুন লাগে। কাঠের তৈরি হওয়ায় তিনতলা রিসোর্টটি দ্রুত ভস্মীভূত হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট চার ঘণ্টা চেষ্টা করে আগুন নেভায়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে রেফ্রিজারেটরের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। হঠাৎ লাগা এই আগুনে পর্যটকদের বাঁচার সুযোগ ছিল না।

আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই তাদের জীবনে ভয়ংকর এক ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। একই সাথে এই ঘটনায় আরও ৬ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। মুগধা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন দগ্ধ হন। তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খানও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। 

অগ্নিকাণ্ডের ফলে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ক্ষতি সাধিত হয়েছে। প্রাকৃতির উপাদান দিয়ে তৈরি সুন্দর রিসোর্টটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের সুনামে এই ঘটনা বড় ধাক্কা দিল। মানুষের মনে সমুদ্র ভ্রমণের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর ভীতি তৈরি হলো। পর্যটন খাতের সামগ্রিক নিরাপত্তার অভাব এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পর্যটকদের জীবন রক্ষায় বিনোদন কেন্দ্রগুলো চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দায়িত্বহীনতার কারণে একের পর এক তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। এভাবে মৃত্যুর মিছিল চলতে থাকলে পর্যটন খাত মুখ থুবড়ে পড়বে।

একটি আনন্দের সকাল কীভাবে শ্মশানে পরিণত হতে পারে তা দৃশ্যমান। কক্সবাজারের বালুকণায় মিশে গেল প্রিয়জনদের শেষ নিঃশ্বাসের করুণ আর্তনাদ। এই শোক আমাদের আজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে এবং কাঁদাবে। বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার। অধিকাংশ ভবনে অনুমোদিত ও মানহীন ক্যাবল দিয়ে ওয়্যারিং করা হয়। অতিরিক্ত লোডের কারণে এসব তার দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে শর্টসার্কিট হয়ে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত ঘটে থাকে। সঠিক প্রকৌশলগত তদারকি ছাড়া বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে।

এই কাঠামোগত ত্রুটিই কোটি মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। ভবন নির্মাণে বাঁশ ও কাঠের মতো দাহ্য পদার্থের অবাধ ব্যবহার চলছে। কক্সবাজারের রিসোর্টটি সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে আগুন লাগার পর তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিপ্রতিরোধক উপাদান ব্যবহার না করায় ভবনগুলো দ্রুত ধসে পড়ে। আইন অমান্য করে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা তৈরির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এটি মানুষের জীবন নিয়ে এক ধরণের প্রকাশ্য জুয়া খেলা। 

অধিকাংশ পর্যটন কেন্দ্রে কার্যকর অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার চরম অভাব রয়েছে। জরুরি মুহূর্তে আগুন নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত সিলিন্ডার থাকে না। ভবনে কোনো স্বয়ংক্রিয় পানির স্প্রিঙ্কলার বা ফায়ার অ্যালার্ম থাকে না। আগুন লাগলে মানুষ জানার আগেই তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

প্রাথমিক প্রতিরোধের কোনো প্রস্তুতি না থাকায় ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জরুরি বহির্গমন পথ বা ফায়ার এক্সিট না রাখা আরেকটি বড় অপরাধ। বহুতল ভবন ও রিসোর্টগুলোতে বিকল্প কোনো সিঁড়ি থাকে না। আগুন লাগলে প্রধান ফটক বন্ধ হয়ে মানুষ ভেতরে আটকা পড়ে। ধোঁয়া ও আগুনের কারণে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। স্থপতি ও মালিকপক্ষের এই গাফিলতি মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।

নকশা বহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ করায়ও সংকট তৈরি হচ্ছে। দেশের হোটেল ও রিসোর্টগুলোর কর্মচারীদের কোনো অগ্নি নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ নেই। আগুন লাগলে কীভাবে পর্যটকদের উদ্ধার করতে হবে তারা জানে না। ভয় পেয়ে তারা নিজেরা আগে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। টুপটুপ রিসোর্টের কর্তৃপক্ষও দুর্ঘটনার পর এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও উদ্ধারকাজে দক্ষতার অভাব পরিস্থিতি আরও জটিল করে। জনবলের এই অজ্ঞতা সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পথ সুগম করে।

নিয়ম অমান্যকারী ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন হলেও বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ স্থাপনাগুলো পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় মালিকপক্ষ বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় অবহেলার সংস্কৃতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি মৃত্যুর মিছিলকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতার চরম অভাব রয়েছে। পর্যটকেরা রুমে গ্যাস বা ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ব্যবহারে অসতর্ক থাকেন। আগুন লাগলে করণীয় সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রচার চালানো হয় না। ভবনে প্রবেশের পর ফায়ার এক্সিট দেখে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এই সামগ্রিক অসচেতনতা ও উদাসীনতা অগ্নিকাণ্ডকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করছে। অগ্নিকাণ্ড রোধে ভবনের নকশা ও নির্মাণ কাঠামো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিটি স্থাপনায় ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অগ্নিপ্রতিরোধক সামগ্রী দিয়ে দেয়াল ও ছাদ নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। বাঁশ বা কাঠের অতি ব্যবহার বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন জরুরি।

প্রতিটি হোটেল ও রিসোর্টে আধুনিক ফায়ার ডিটেক্টর স্থাপন করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় ফায়ার অ্যালার্ম ও পানির স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম যুক্ত করা আবশ্যক। পর্যাপ্ত পরিমাণে মানসম্মত অগ্নি নির্বাপক সিলিন্ডার দৃশ্যমান স্থানে রাখতে হবে। নিয়মিত বিরতিতে এসব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা ও সচল রাখা নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আগুনের প্রাথমিক অবস্থাতেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। ভবনে পর্যাপ্ত প্রশস্ত জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা দরকার। ফায়ার এক্সিটের পথ সবসময় বাধা মুক্ত ও উন্মুক্ত রাখতে হবে। দিকনির্দেশক সাইন বোর্ডগুলো রাতেও জ্বলজ্বল করার ব্যবস্থা করা দরকার। আপদকালীন সময়ে মানুষ যেন সহজে বের হতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। নকশায় বিকল্প পথ না থাকলে ভবনের ব্যবহারিক অনুমতি দেওয়া যাবে না।

এটি মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার রক্ষা করতে পারে। সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নিয়মিত ফায়ার ড্রিল আয়োজন করতে হবে। আগুন নেভানো ও জরুরি উদ্ধারের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আপদকালীন সময়ে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। প্রশিক্ষিত জনবল থাকলে প্রাথমিক অবস্থাতেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

অগ্নি নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অবহেলার কারণে মৃত্যু হলে মালিকপক্ষকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। লাইসেন্স বাতিলসহ ভারী জরিমানার বিধান কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হলে সবাই সচেতন হতে বাধ্য হবে। অপরাধ করে পার পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

মেরিন ড্রাইভের মতো পর্যটন এলাকায় বিশেষ ফায়ার স্টেশন স্থাপন করতে হবে। উদ্ধারকাজের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দ্রুতগতির যান সরবরাহ করা দরকার। পানির বিকল্প উৎসের জন্য রিসোর্ট এলাকায় জলাধার নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে দেবে।

লেখক: কলামিস্ট


কেকে/সাশ



মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close