কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে দশ পর্যটকের মৃত্যু কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি কাঠামোগত বিপর্যয়। কাঠের পাটাতন, কাঠের সিঁড়ি, টিনের ছাদ আর গাছের খুঁটির ওপর দাঁড়ানো রেস্তোরাঁ নিয়ে তিনতলা একটি ভবন তিন বছর ধরে পর্যটক নিয়ে চলেছে, অথচ সেখানে ছিল না অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, ছিল না ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন, এমনকি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনই করা হয়নি। জেলা প্রশাসক নিজেই বলেছেন, রিসোর্টটি সরকারি অনুমোদন ছাড়া চলছিল। প্রশ্ন হলো, এত বড় একটি স্থাপনা তিন বছর ধরে প্রকাশ্যে, মেরিন ড্রাইভের পাশে, কীভাবে নজর এড়িয়ে টিকে থাকল।
প্রথম দায় রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের। মুনাফার লোভে তারা মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন। আইন মেনে ভবন নির্মাণ, নিরাপদ বহির্গমন পথ ও আগুন নেভানোর সরঞ্জাম রাখা ন্যূনতম বাধ্যবাধকতা, যা তারা উপেক্ষা করেছেন। পুলিশ মামলা করেছে, মালিকদের একজনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে, ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, কিন্তু যথেষ্ট নয়। দায়ের দ্বিতীয় অংশ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর। কউক, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ, কেউ কি একবারও জানতে চায়নি এই রিসোর্টের বৈধতা কী?
অনুমোদনহীন স্থাপনা চোখের সামনে চলতে থাকলে বুঝতে হবে তদারকি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, অথবা তার পেছনে রয়েছে অবহেলা ও যোগসাজশ। পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্য তালিকায় এসব সংস্থার প্রতিনিধিই রয়েছেন, ফলে নিজেদের ব্যর্থতার তদন্ত নিজেরাই করার স্বার্থের সংঘাতও এড়ানো যায় না। অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে ব্যবধান স্পষ্ট হয়। যুক্তরাজ্যে হোটেল বা গেস্টহাউস চালু করতে স্থানীয় কাউন্সিলের পরিকল্পনা অনুমতি, বিল্ডিং রেগুলেশনস অনুযায়ী পরিদর্শন এবং বাধ্যতামূলক অগ্নিঝুঁকি মূল্যায়ন লাগে। প্রতিটি ঘুমানোর স্থানের জন্য অগ্নি-শনাক্তকরণ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় ফায়ার মার্শালের পরিদর্শন, অকুপেন্সি সার্টিফিকেট, স্প্রিংকলার ও ফায়ার অ্যালার্ম ছাড়া কোনো আবাসিক ভবনে অতিথি রাখা যায় না। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পর্যটন লাইসেন্সের আগে ভবন-নিরাপত্তা ও অগ্নিনিরাপত্তা সনদ বাধ্যতামূলক, নিয়মিত নবায়নও করতে হয়। সেখানে কাঠের কাঠামো থাকলেও অগ্নিনিরোধক প্রক্রিয়া ও নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার বিধান কঠোরভাবে মানা হয়। আমাদের এখানে নিবন্ধনের ধাপ আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই।
এখন সরকারের করণীয় পরিষ্কার। তদন্ত প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে এবং স্বার্থের সংঘাত এড়াতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ যুক্ত করতে হবে। যেসব কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হবে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে, শুধু মালিকপক্ষকে নয়। কক্সবাজারসহ সব পর্যটন এলাকায় অননুমোদিত রিসোর্ট ও হোটেলের তালিকা তৈরি করে দ্রুত পরিদর্শন চালাতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণগুলো বন্ধ বা সংস্কার করতে হবে।
অনুমোদন, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ও পরিবেশ ছাড়পত্র একটি একক ডিজিটাল ব্যবস্থায় এনে প্রকাশ্য করা দরকার, যাতে পর্যটক নিজেই যাচাই করতে পারেন। নিহত ও আহতদের পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যে দশজন এই অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।
তারা আর ফিরে আসবে না কিন্তু এই মৃত্যু যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি ব্যবস্থার সংস্কারের সূচনা না হয়, তবে পরের দুর্ঘটনার জন্য আমরা সবাই সমানভাবে দায়ী থাকব।
কেকে/সাশ