মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● তারেক রহমানকে ঘিরে রাজশাহীতে উৎসবের আমেজ, উন্নয়ন নিয়ে যত প্রত্যাশা      ● ডেঙ্গু কেড়ে নিল আরও চার প্রাণ      ● সরকারি চাকরিজীবীদের এ মাসেই বাড়তি বেতন, প্রজ্ঞাপন জারি      ● প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন      ● আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু      ● ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী       ● গণবিক্ষোভে অস্থির ফ্রান্স, গ্রেপ্তার ২৪০০—ম্যাক্রোঁর কঠোর বার্তা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
স্ট্যাগফ্লেশনের চক্রে বাংলাদেশ : কারণ ও উত্তরণের পথ
মো. কামরুজ্জামান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৭ এএম আপডেট: ২০.১০.২০২৬ ১২:৩৫ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির যে চিত্র এঁকেছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। নিম্ন প্রবৃদ্ধি আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ ও কষ্টকর চক্র, অর্থাৎ স্ট্যাগফ্লেশনের দিকেই এগোচ্ছে দেশ। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি নেমে আসবে মাত্র ৩.২ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে তা ৩.৪ শতাংশ। সরকারের ৬.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি অর্ধেকের কাছাকাছি, আইএমএফের ক্ষেত্রে অর্ধেকেরও কম।

স্বাভাবিক নিয়মে এমন নিম্ন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমে আসার কথা। অথচ আইএমএফ বলছে, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে ১০.৯ শতাংশে উঠবে। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কথা, এমন পূর্বাভাসও করা হচ্ছে, এই সংকট চলতে পারে ২০৩১ সাল পর্যন্ত। প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশ স্ট্যাগফ্লেশনের এই ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে, আর এর থেকে বেরোনোর পথই বা কী?

তিন লক্ষ্যের টানাপোড়েন : 

যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক নীতি মূলত তিনটি লক্ষ্যকে ঘিরে আবর্তিত হয়— ১) উচ্চ ও টেকসই প্রবৃদ্ধি, ২) দামস্তর মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং ৩) কর্মসংস্থান বাড়িয়ে বেকারত্ব যথাসম্ভব কমানো। এই তিনটি সূচকই সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে জড়িত। বিনিয়োগ, উৎপাদন, ভোগ, বণ্টন, মুদ্রানীতি, সুদের হার, কর কাঠামো, সরকারি ব্যয়, আমদানি-রপ্তানি নীতি- সবকিছুই শেষ পর্যন্ত এই তিন লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়। 

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের জন্য, বিশেষ করে উন্নয়নের এই পর্যায়ে, বিশ্লেষকেরা ৬ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে কাঙ্ক্ষিত মনে করেন। মূল্যস্ফীতি ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে বলে ধরা হয়।

কিন্তু সমস্যা হলো, এই সূচকগুলো প্রায়ই একে অপরের উল্টোপথে চলে। ধরা যাক, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে সুদের হার বাড়ানো হলো। এর ফলে বিনিয়োগ কমবে, বিনিয়োগ কমলে উৎপাদন কমবে, বেকারত্ব বাড়বে, প্রবৃদ্ধিও ধীর হবে। তবে লাভ হবে একটাই— মুদ্রার সরবরাহ ও মানুষের আয় কমায় চাহিদা কমবে, ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। 

আবার সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতিতে ঘটে ঠিক উল্টোটা। সুদের হার কমলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ে, কিন্তু একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে মানুষের কষ্ট বাড়ায়। অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েন সামলাতে নীতিনির্ধারকেরা মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির হাতিয়ারগুলো সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগান।

স্ট্যাগফ্লেশন কেন, কীভাবে : 

স্ট্যাগফ্লেশন মূলতঃ stagnation এবং inflation এর যৌথরূপ। এটি এমন একটি বিদঘুটে অবস্থা, যখন মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে আর একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি কমে যায়। গতানুগতিক মুদ্রানীতি বা রাজস্বনীতি এ সময় তেমন কাজ করে না।

বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ সুদের হার ধরে রেখে সংকোচনমূলক নীতি অনুসরণ করে আসছে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল অসহনীয় মূল্যস্ফীতি কমানো। কিন্তু এতে তেমন ফল মেলেনি। মূল্যস্ফীতি শীর্ষ থেকে নামলেও ৮ শতাংশের ওপরেই আটকে আছে (সেপ্টেম্বরে ৮.৩৪ শতাংশ)। অন্যদিকে কর্মসংস্থান প্রায় স্থবির, আর প্রবৃদ্ধি আটকে গেছে দীর্ঘ মন্দাগতির মধ্যে। চলতি অর্থবছরের আইএমএফ এর পূর্বাভাসিত প্রবৃদ্ধি (৩.২ শতাংশ) প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই অবস্থায় প্রধান দাতা সংস্থাগুলোর বিরূপ পূর্বাভাস সংকটকে আরও ঘনীভূত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

আমাদের অর্থনীতিতে এমন অবস্থার পেছনে আসলে বহুমাত্রিক কারণ দায়ী। কভিড-১৯ ও তৎপরবর্তীকালে বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থার ধাক্কা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সুশাসনের দীর্ঘ ঘাটতি অর্থনীতিতে স্থায়ী কালো ছাপ ফেলে দিয়েছে। এই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমেই কমে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এ বছরের জুনে নেমে গেছে ৪.৫ শতাংশে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির তীব্র সংকট। এসব কারণে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ভয়ানক চাপে পড়েছে। ফলস্বরূপ বিগত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে গেছে ৪.১৪ শতাংশে।

অন্যদিকে মুদ্রানীতির প্রচলিত হাতিয়ারগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তেমন কাজ করেনি। টাকা ছাপিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটানোর ধারাবাহিক প্রবণতা এবং সাম্প্রতিক পে-স্কেলের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি কমতে গিয়েও আবার বাড়ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানির তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধিই সামগ্রিক দামস্তর ঠেলে তোলায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে হচ্ছে।

স্ট্যাগফ্লেশনের এই চক্র ভাঙতে দরকার বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। প্রথমে আমাদের স্বীকার করতে হবে, অর্থনীতিতে কিছু গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। সঠিক চিকিৎসা না হলে সেগুলো অচিরেই ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো। বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বিদেশি বড় বড় উদ্যোক্তাদের জন্য উপযুক্ত বিনিয়োগ-পরিবেশ ও অবকাঠামো আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। আবার ব্যাংক খাতের নাজুক দশার কারণে অভ্যন্তরীণ বেসরকারি বিনিয়োগও থমকে আছে। এই বিষয়গুলো আমাদের গভীরভাবে ভাবা দরকার। 

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি কিছু রিফাইন্যান্স স্কিম চালু করেছে। এর মাধ্যমে বন্ধ, রুগ্ন ও আংশিক সচল শিল্প প্রতিষ্ঠানকে স্বল্পসুদে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে। এসএমই ও কৃষি খাতেও কিছু স্কিম রয়েছে যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। নিঃসন্দেহে এসব উদ্যোগ ভালো। তবে এগুলোর পরিধি আরও বাড়ানো উচিত। অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এখনই বন্ধ করতে হবে; নতুন মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। সব ধরনের বিলাসী ব্যয় পরিহার করতে হবে।

ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে সবসময় বিরূপ প্রভাব ফেলে। এখন জাতি দুটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত। এক, বহির্বিশ্বের অস্থিরতা কতদিন চলবে আমরা জানি না। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যুদ্ধ ইতোমধ্যে সংকটে রূপ নিয়ে আমাদের প্রধান জ্বালানি তেল-গ্যাসের সরবরাহ অনিশ্চিত করে তুলেছে। দুই, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংকটের অনিশ্চয়তা ক্রমেই ঘনীভূত হওয়া।

সম্প্রতি সিপিডির সম্মানিত ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে সরকারের উচিত সবার আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়। কিন্তু আগেই বলেছি, স্ট্যাগফ্লেশনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি দমনের গতানুগতিক হাতিয়ারগুলো তেমন কাজ করে না। এ জন্য প্রয়োজন মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বিত প্রয়োগ এবং উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী বড় বড় বিনিয়োগ।

উল্লেখ্য, কভিড-পরবর্তী বিশ্বে প্রায় সব দেশই মূল্যস্ফীতি সামলাতে সাফল্য দেখিয়েছে। ভারত তো বটেই, শ্রীলঙ্কা, এমনকি পাকিস্তানও এ ক্ষেত্রে বেশ এগিয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখতে পারি। 

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকটকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো পরস্পরকে প্রভাবিত করে অর্থনীতির সামগ্রিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই শুধু সুদের হার বাড়ানো বা কমানো কিংবা বিচ্ছিন্ন কিছু প্রণোদনা ঘোষণা যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবারও টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close