একটি হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে থাকে রক্তের দাগ, স্বজনদের চোখে জমে অশ্রু, আর সমাজের সামনে দাঁড়ায় একের পর এক প্রশ্ন। নিহত ব্যক্তিটি সাংবাদিক হলে প্রশ্নটি আরও গভীর হয়। যিনি অন্যায়ের মুখোশ খোলেন, নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হন, তাকেই যদি সত্য প্রকাশের মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে, তবে সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে কে? যে সমাজ সত্য প্রকাশকারীকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেখানে সাধারণ নাগরিক নিরাপদ থাকবে কীভাবে?
সাংবাদিকের ওপর হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষতি নয়; এটি জানার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার জবাবদিহির ওপর আঘাত।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১৩০ বার পিছিয়েছে; পরবর্তী তারিখ ৫ নভেম্বর। আসামিদের মধ্যে তানভীর রহমান খান জামিনে আছেন, নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল জামিন নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন, বাকিরা হেফাজতে আছেন।
হাইকোর্ট ২০২৪ সালে অভিজ্ঞদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন, ছয় মাসে তদন্ত শেষ এবং র্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। পরে টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দেওয়া হয়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অন্য এক মামলার কল রেকর্ড বিশ্লেষণে এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার প্রাথমিক ইঙ্গিতের কথা বলেছেন, যদিও সাগর-রুনি মামলাটি ওই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারে পড়ে না বলেও স্পষ্ট করেছেন। এটি কেবল ইঙ্গিত; কারও দোষ বা নির্দোষিতা নিয়ে অনুমান করার সুযোগ নেই। কিন্তু চৌদ্দ বছর পরও নতুন সূত্রের উল্লেখ প্রমাণ করে, অনুসন্ধানের বাইরে কত সম্ভাবনা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার বিচারচিত্র উদ্বেগজনক। সিপিজের হিসাবে ১৯৯২ সাল থেকে অন্তত ১৩ জন সাংবাদিকের মৃত্যু পেশাগত কারণে নিশ্চিত হয়েছে; আরও কয়েকজনের মৃত্যুর কারণ এখনো অনিশ্চিত। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা গত দশকে অন্তত ১৫ জনের কথা বলেছেন, আর প্রথম আলোর হিসাবে ১৫ বছরে নিহত হয়েছেন ৩০ জন। সিপিজের ২০২১ সালের বৈশ্বিক বিচারহীনতা সূচকে বাংলাদেশ ছিল একাদশ। সাংবাদিকদের কার্যকর সুরক্ষা-কাঠামোর অভাবও স্পষ্ট।
২০১৭ সালে শাহজাদপুরে সমকালের প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল নিহত হন; অভিযোগ ওঠে তৎকালীন পৌর মেয়রের বিরুদ্ধে। আপিল বিভাগ দ্রুত বিচারের নির্দেশ দিলেও মামলার অগ্রগতি ধীর ছিল। ২০২৩ সালে জামালপুরে নিহত গোলাম রাব্বানী নাদিমের মামলায় সিআইডির প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তির পর ২০২৪ সালে আদালত র্যাবকে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়। নিহতের স্ত্রী এখনো অভিযোগ করেন, বিচার এগোয়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকা টাইমসের মেহেদী হাসান তুহিন নিহত হন; সে সময়ের হত্যাকাণ্ডগুলোর স্বতন্ত্র তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। ২০২৫ সালে গাজীপুরে হামলার ভিডিও ধারণের কারণে আসাদুজ্জামান তুহিন নিহত হন; এক দিনে সাতজন গ্রেপ্তার হলেও বিচারের পরিণতিই বলে দেবে রাষ্ট্র কতা বদলেছে। একই বছর নবীনগরে খন্দকার শাহ আলমও নিহত হন। প্রতিটি মামলার প্রেক্ষাপট আলাদা, কিন্তু চিন্তার বিষয় এক: পরিকল্পনাকারী বা সবচেয়ে ক্ষমতাবান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রায়ই বিচারের কাঠগড়ায় পৌঁছান না।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৩ সালে ২ নভেম্বরকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়মুক্তি অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণা করে। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালে বিশ্বে ১,৭০০-র বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ হত্যার বিচার হয়নি।
এই বাস্তবতার মধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধান ভাবনাটি হলো, দায়মুক্তি নিজেই পরবর্তী সহিংসতার উৎস। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক বলেছেন, বিচারহীনতা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর ভীতির প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বিচারহীনতার ‘ভয়াবহ সংস্কৃতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, সাগর-রুনি হত্যার তদন্তই এক দশকেও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়নি।
আলোচিত আন্তর্জাতিক মামলাগুলোতেও একটি বিষয় অভিন্ন : হত্যাকারী শনাক্ত হলেও নির্দেশদাতা বা মূল সুবিধাভোগী প্রায়ই রহস্যেই থেকে যান।
মাল্টার ডাফনি কারুয়ানা গ্যালিজিয়র কথাই ধরা যাক। ২০১৭ সালে গাড়িবোমায় নিহত এই অনুসন্ধানী সাংবাদিক দেশটির ক্ষমতাকেন্দ্রের দুর্নীতি নিয়ে লিখছিলেন। ২০২১ সালের তিন বিচারকের এক প্যানেলের ৪৩৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্র তাকে রক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে এবং রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত আক্রমণ তার হত্যার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মাসকাট পদত্যাগ করেন। অথচ ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর জুরি আট-এক ভোটে ব্যবসায়ী ইয়র্গেন ফেনেককে হত্যায় সহযোগিতা ও অপরাধমূলক সংগঠনের অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। ২২ সেপ্টেম্বর অ্যাটর্নি জেনারেল রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
স্লোভাকিয়ায় ইয়ান কুচিয়াক হত্যায় খুনিদের সাজা হলেও নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত মারিয়ান কচনারের বিরুদ্ধে বিচার দীর্ঘ ও জটিলতা লক্ষ্য করা গেছে। ভারতে গৌরী লঙ্কেশ হত্যার বিচার বারবার বিচারক বদলের কারণে দীর্ঘায়িত হয়েছে। রাশিয়ায় আনা পলিতকোভস্কায়ার খুনিদের দণ্ড হলেও নির্দেশদাতা শনাক্ত হননি। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে নিহত হন জামাল খাশোগি। সৌদি আদালতের বিচারে প্রথমে কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড হয়, পরে তা ২০ বছরের কারাদণ্ডে নামানো হয়। জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার এটিকে পূর্বপরিকল্পিত বিচারবহির্ভূত হত্যা বলে আখ্যা দেন। হত্যায় কয়েকজনকে সাজা দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততার প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ফিলিপাইনের ম্যাগুইন্দানাও গণহত্যায় ৩২ জন সাংবাদিক নিহত হন; দীর্ঘ বিচারের পর প্রভাবশালী আম্পাতুয়ান পরিবারের সদস্যদের দণ্ড প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও টেকসই চাপ থাকলে ক্ষমতাবানদেরও বিচারের আওতায় আনা সম্ভব। আমাদেরকে ও ফিলিপাইনের পথে হাটতে হবে। সকল সাংবাদিক হত্যার বিচার দ্রুত নিষ্পন্ন করতে হবে।
শিক্ষা তিনটি।
প্রথমত, সরাসরি হত্যাকারীর শাস্তিতে বিচার সম্পূর্ণ হয় না; আসল পরীক্ষা পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাকে শনাক্ত করা।
দ্বিতীয়ত, তদন্তকারী বদল, প্রতিবেদন পিছানো এবং আসামি বাদ দেওয়া মামলা ঝুলিয়ে রাখার পরিচিত কৌশল।
তৃতীয়ত, যেখানে অগ্রগতি হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অবিরাম জনচাপ কাজ করেছে।
বিচারহীনতা কেন অপরাধ বাড়ায়, তার ব্যাখ্যা মেলে কয়েকটি তত্ত্বে। গ্যারি বেকারের প্রতিরোধ তত্ত্ব বলে, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি কার্যকর। ধরা পড়ার আশঙ্কা নগণ্য হলে হত্যা কিছু মানুষের কাছে ‘সহজ সমাধান’ হয়ে দাঁড়ায়। বান্দুরার সামাজিক শিখন তত্ত্ব বলে, একজন অপরাধী পার পেয়ে গেলে অন্যরা তা অনুকরণ করে।
টম টাইলারের গবেষণা দেখায়, আইনের প্রতি আস্থা ভাঙলে ব্যবস্থার ন্যায্যতাও ক্ষীণ হয়। নয়েল-নয়মানের ‘নীরবতার সর্পিল’ ব্যাখ্যা করে, বিপদ বুঝলে মানুষ কথা বলা বন্ধ করে; ফলে সংবাদকক্ষে সেল্ফ-সেন্সরশিপ বাড়ে। অর্মত্য সেন বলেছেন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম আছে এমন গণতান্ত্রিক সমাজে দুর্ভিক্ষ ঘটে না, কারণ সংকট আড়াল রাখা যায় না।
টিমোথি বেসলি ও রবিন বার্জেস (২০০২) ভারতের রাজ্যগুলোর ওপর গবেষণায় দেখান, যেখানে সংবাদপত্রের প্রচার বেশি, সেখানে সরকার বন্যা ও খাদ্যসংকটে বেশি সাড়া দেয়। ফলে সাংবাদিকের মুখ বন্ধ করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে সরানো নয়, পুরো সমাজের তথ্যব্যবস্থায় ছিদ্র করা। তখন দুর্নীতি, ভূমিদখল, মাদক বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধ অগোচরে বাড়তে থাকে। গণমাধ্যমের এজেন্ডা-নির্ধারণী ভূমিকা (ম্যাককম্বস ও শ’, ১৯৭২) দুর্বল হলে নাগরিকরাও জানতে পারেন না কোন সমস্যাটি আলোচনার অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
সাংবাদিক মানেই ভয়হীন মানুষ, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তারও পরিবার আছে, ফিরে যাওয়ার ঘর আছে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর হুমকি খেয়ে, হামলার আশঙ্কায় দিন কাটিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা গড়ে ওঠে না। সংবাদককে ভয় ঢুকলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও জনস্বার্থের খবরই সংকুচিত হয়। অপরাধিরা পার পেয়ে যায় ।
গণমাধ্যমেরও নিজস্ব দায়িত্ব আছে। তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, পেশাগত সততা ও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা সাংবাদিকতার ভিত্তি। ভুল হলে তা সংশোধন হবে, অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে আইনসম্মত পথে। কিন্তু কোনো প্রতিবেদন অপছন্দ হওয়া বা সাংবাদিকের পেশাগত ভুল কখনোই হামলা বা হত্যার অজুহাত হতে পারে না। সমালোচনার জবাব হবে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে, সহিংসতা দিয়ে নয়।
ফলে এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি; হুমকি, হামলা ও হত্যার দ্রুত ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা; সাংবাদিক হত্যার বিচারে বিশেষ প্রসিকিউটর ও সময়সীমাবদ্ধ বিচারপ্রক্রিয়া চালু করা; তদন্তকে শুধু হত্যাকারী নয়, পরিকল্পনাকারী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া; মামলার অগ্রগতি ও বিলম্বের কারণ প্রকাশে জনসমক্ষে ডেটাবেজ রাখা; সাক্ষী ও নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; এবং মফস্বলের সাংবাদিকদের জন্য বিমা, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে চালিত করতে, গণমানুষের সার্বিক মঙ্গলের জন্য সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে রাষ্ট্রের বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস