জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের অর্থনীতি যখন গভীর সংকটে, তখন সেটিকে ঘুরে দাঁড় করানোর ভার এসে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। সে কারণে ২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল একদিকে চাপের, অন্যদিকে নীতিগত পুনর্বিন্যাসের বছর। কিন্তু বছর শেষের পথে দাঁড়িয়ে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথাই বলছে। কাক্সিক্ষত বড় পরিসরের কাঠামোগত সংস্কার যেমন দেখা যায়নি, তেমনি অর্থনীতিকে নতুন করে গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগও চোখে পড়েনি।বরং সরকারের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও চাপে ফেলেছে। অনিশ্চয়তা বেড়েছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়েছে, স্থবিরতা নেমে এসেছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। যদিও সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে- যেমন রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং ব্যাংক খাতে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ- সীমিত অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে, তবু সেগুলোর ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়নি।
সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগের গতি ফেরানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। ফলে ২০২৫ সাল সংস্কার ও পুনর্গঠনের বছর হওয়ার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে পূরণ হয়নি বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
২০২৫ সালে বেসরকারি খাত স্মরণকালে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ব্যবসা-বাণিজ্যকে স্থবির করেছে। প্রায় অর্ধেক ব্যবসায়ী সংগঠন কার্যত বন্ধ, অনেক কারখানা বন্ধ বা বন্ধের পথে এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদা কমেছে।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এলসি সমস্যা, হঠাৎ জ্বালানি সংকট এবং বিদেশি বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণও সমস্যা জটিল করছে। সরবরাহ ও ঋণের ঘাটতি, লজিস্টিক সমস্যা এবং কর-ভ্যাটসংক্রান্ত জটিলতা বেসরকারি খাতের কার্যক্রমকে সীমিত করেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তার ছায়া : ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ছিল অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় ভরা একটি বছর। খুচরা ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় শিল্প খাত- সবখানেই স্থবিরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে গত এক বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া বহু শিল্পকারখানা পুনরায় চালু হয়নি। নতুন বিনিয়োগ কার্যত থমকে গেছে, অনেক উদ্যোক্তা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন; উচ্চ সুদহার, কম বিক্রি ও নগদ সংকটে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে- তবে এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়েনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিয়েছে, ফলে ভোগব্যয় সংকুচিত হয়েছে। বাজার, শপিংমল, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পর্যটন এলাকাগুলোয় প্রত্যাশিত বেচাকেনা ও ভিড় দেখা যায়নি।
এদিকে রপ্তানি খাতেও শ্লথগতি লক্ষ করা গেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাবে রপ্তানি আয় কমেছে। একইসঙ্গে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও নীতিগত সক্ষমতাকে সীমিত করেছে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অপেক্ষা ও টিকে থাকার বছর।
ব্যাংক খাত : সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের লড়াই : দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও অনিয়মের ফলে দেশের ব্যাংকিং খাত যে গভীর সংকটে ছিল, তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ২০২৫ সালে। এ বছরটি একদিকে সংকটের বাস্তব চিত্র উন্মোচনের, অন্যদিকে সেখান থেকে উত্তরণের প্রাথমিক প্রচেষ্টার সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নানা সংস্কার উদ্যোগ ও কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ব্যাংকিং খাত এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঋণের ৩৫ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি, যা এই খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও প্রভাবশালী মহলের সুবিধা দেওয়ার ফলে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারিতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে। সংকট মোকাবিলায় দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একত্র করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যেখানে সরকার বিপুল মূলধন সহায়তা দিয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ সুদহার ও কঠোর মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য চাপের মধ্যেই রয়েছে।
২০২৫ সালে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ ও ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ’সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ৯টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ব্যাংকিং খাতের জন্য ছিল সংকট ও সংস্কারের সন্ধিক্ষণ।
রপ্তানি খাতে শ্লথগতি : ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে শ্লথগতি স্পষ্টভাবে লক্ষ করা গেছে। নভেম্বরে রপ্তানি আয় ৩.৮৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ৪.১১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বছরে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৫.৫৪ শতাংশ কমেছে।
রাজস্ব আয় কমেছে, দাতাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি : বছরজুড়েই টাকার তীব্র সংকটে ভুগেছে সরকার। কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় ব্যাংক ঋণ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সামাল দিতে হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত রাখতে হয়েছে। বছরের শুরুতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা যে ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, এনবিআরের কর্মকর্তাদের আন্দোলন ও পরবর্তীতে ছাঁটাইয়ের কারণে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ও সংকটে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৩ কোটি টাকা। তবে আলোচ্য সময়ে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রথম পাঁচ মাসেই রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৭ কোটি টাকায়।
পুঁজিবাজারে হতাশার বছর : ২০২৫ সালে বাংলাদেশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও লেনদেন অস্থিরতার শিকার হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই বাজারের ৮০ শতাংশ অংশীদার হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সূচক ও লেনদেন তলানিতে নেমেছে। বছরের শুরু থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএসইএক্স ৫ হাজার ২১৮ পয়েন্ট থেকে ৪ হাজার ৮২৬ পয়েন্টে নামেছে। শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১৬৭ পয়েন্ট কমে ৯৯৯ পয়েন্টে এবং ডিএস ৩০ সূচক ৮৮ পয়েন্ট কমে ১,৮৫৪ পয়েন্টে নেমেছে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সিএএসপিআই ৯১২ পয়েন্ট কমে ১৩,৫৬১ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
বছরজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণও নগণ্য। মাত্র দুটি রাইট শেয়ার ইস্যুতে ৩২৮ কোটি টাকা উত্তোলন হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের ৬৫,৯৬২টি বিও হিসাব নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। পাঁচটি শরিয়াহ ব্যাংক তালিকাচ্যুত হয়েছে এবং ৮টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। বিএসইসি ‘টিক সাইজ’ নীতি পরিবর্তন করে এক টাকার নিচের শেয়ারের লেনদেন সহজ করেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সহজ হয়নি। ব্রোকারেজ হাউসগুলোও লেনদেন কম হওয়ায় অনেক শাখা অফিস বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। সার্বিকভাবে, ২০২৫ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও গতি হারানো বছরের মতো মনে হয়েছে।
প্রবাসী আয়ে উল্লম্ফন : ২০২৫ সালজুড়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লম্ফন দেখা গেছে। জানুয়ারি থেকে চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান, কার্যকর প্রণোদনা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মানোন্নয়ন রেমিট্যান্স বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও বর্তমানে স্বস্তি বিরাজ করছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে মোট ১৫ হাজার ৫৬৯ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৩ হাজার ৩৭০ মিলিয়ন ডলার।
রিজার্ভে স্বস্তি : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ড. আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডলার সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারিতে বৈধপথে প্রবাসী ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পায়। চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে, রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরোনো আমদানি দায় পরিশোধ হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমেছে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নীতি অব্যাহত থাকায় রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে। গত ২৪ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, গ্রস রিজার্ভ ৩২.৭৯ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফ পদ্ধতিতে ২৮.১২ বিলিয়ন ডলার। ডলারের বাজার দর বছরের অধিকাংশ সময় ১২২-১২৩ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল।
কেকে/এআর