বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। দুদেশের মধ্যকার কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়েই চলছে। প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন ইস্যু নিয়ে বাগযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন দুদেশের কূটনৈতিকরা। বিরোধ এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে, কূটনৈতিক মিশন ঘিরে নিরাপত্তার শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এমনকি পাল্টা কূটনৈতিক তলবের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া ভারতের উগ্রবাদী সংগঠনগুলো বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে দেশটির গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। এতে দুদেশের মধ্যকার তিক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিপক্ষে সংখ্যালঘু নির্যাতনে অভিযোগ আনা হয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ বারবার নাকচ করে আসছে সরকার। বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে উল্লেখ না করতেও বলা হয়েছে দিল্লিকে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন ব্যবস্থাও নিচ্ছে সরকার।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দুদেশের সম্পর্ক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভারতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অযাচিত অভিযোগ আনছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বর্ণনা করে তা প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ভারতের বিভিন্ন মহলকে সংখ্যালঘু বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বর্ণনা ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস এম মাহবুবুল আলম গত রোববার এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন। তিনি বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সাংবাদিকদের এ বিবৃতির কথা জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের সাম্প্র তিক মন্তব্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তার মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়। বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে এমন কোনো বিভ্রান্তিকর, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বর্ণনা বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে।’
বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধমূলক ঘটনাকে পরিকল্পিতভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে। আরও বলা হয়, ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে দিতে তার অপব্যবহার করা হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু মহলে বাছাইকৃত ও পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সাধারণ ভারতীয় জনগণকে বাংলাদেশ, ভারতের বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যে ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন, তিনি ছিলেন তালিকাভুক্ত অপরাধী। চাঁদাবাজির সময় তার মুসলিম সহযোগীর সঙ্গে থাকা অবস্থায় তার দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু ঘটে, যাকে পরবর্তীতে গ্রেপ্তার করা হয়। এ অপরাধমূলক ঘটনাকে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়, বরং বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বর্ণনা ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ভারতের বিভিন্ন মহলকে বিভ্রান্তিকর বর্ণনা ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে, যা সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থার চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে।’
ভারতে মুসলিম-খ্রিষ্টানসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি তুলে ধরে এক প্রশ্নের জবাবে আলম বলেন, ভারতে মুসলিম, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিঘ্ন সৃষ্টির ঘটনায় ঢাকা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
তিনি জানান, চলতি মাসে উড়িষ্যায় চুরির অভিযোগে জুয়েল রানা নামে এক মুসলিম যুবকের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, বিহারে মোহাম্মদ আতাউর হোসেনের হত্যাকাণ্ড, কেরালায় বাংলাদেশি সন্দেহে এক নিরীহ ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা এবং বিভিন্ন স্থানে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে একাধিক গণহিংসা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে বড় ধর্মীয় উৎসব বড়দিন উদযাপনের সময়ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনাকে ঘৃণাজনিত অপরাধ ও লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমরা আশা করি, ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনবে।’ তিনি আরও বলেন, প্রতিটি দেশেরই দায়িত্ব তার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই সে দায়িত্ব পালন করা।
১৪ ভারতীয়কে ফেরত পাঠাল বিজিবি
১৪ ভারতীয় নাগরিককে কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে এ ১৪ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছিল ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। গতকাল রোববার দুপুরে কুষ্টিয়ার মিরপুরে ৪৭ বিজিবির তত্ত্বাবধানে আনুষ্ঠানিকভাবে পুশব্যাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানান, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিএসএফ ওই ১৪ জন ভারতীয় নাগরিককে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করে। এ ঘটনায় বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে আপত্তি জানিয়ে কড়া অবস্থান গ্রহণ করে। পরে ভারতের বিএসএফের ১৪৬ ব্যাটালিয়নের কমান্ডেন্ট প্রেমপাল সিংয়ের উপস্থিতিতে রোববার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠানো হয়।
তিনি আরও বলেন, বিজিবির মোহাম্মদপুর কোম্পানি কমান্ডার এবং বিএসএফের জলংগী কোম্পানি কমান্ডারের সমন্বয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ১৪ জনকে সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করা হয়।
বিজিবি ও পুলিশ সূত্র জানায়, গত শুক্রবার গভীর রাতে তীব্র শীত, ঘন কুয়াশা ও অন্ধকারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারতের নদীয়া জেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিএসএফ সদস্যরা তাদের দর্শনা সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। পুশইন হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬ জন পুরুষ, ৬ জন নারী ও ২ জন শিশু ছিল।
পুশইনের পর তারা দর্শনা হল্ট স্টেশনের কাছে একটি গাছের নিচে অবস্থান নিতে বাধ্য হন। প্রচণ্ড শীত ও দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে তারা চরম দুর্দশায় পড়লে স্থানীয়দের নজরে বিষয়টি আসে। পরে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে খবর পেয়ে দর্শনা থানা পুলিশ ও দর্শনা বিজিবির একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পরিচয় ও ঠিকানা নিশ্চিত করে।
কেকে/ আরআই