আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমার শেষ দিন আজ বিকাল ৫টা পর্যন্ত। শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক দল ও জোটের সমীকরণে একের পর এক চমক রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের আগ্রহও বাড়িয়েছে। নির্বাচনের মনোনয়ন সংগ্রহ ও জমার শেষ প্রান্তে এসে বিভিন্ন আসনে জোটের প্রার্থী তালিকায় নতুন মুখের সংযোজন, আবার কোথাও কোথাও দলীয় সিদ্ধান্তে আকস্মিক প্রার্থী প্রত্যাহারের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তি উত্তাপ তৈরি করেছে। ফলে মনোনয়ন জমার শেষ দিনে আরও চমক দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমার শেষ দিনে এসে জোট রাজনীতির ভাঙাগড়া প্রক্রিয়ায় দোলাচলে পড়েছেন অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী। শেষ মুহূর্তের আসন সমঝোতা, জোটের ভেতরের রদবদল এবং দলীয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তনে কারও জন্য তৈরি হয়েছে আশার আলো, আবার কারও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পড়েছে অনিশ্চয়তার মুখে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, রোববার বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৩০০ আসন থেকে ৩ হাজার ১৪৪ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। আর জমা দিয়েছেন ১৬৬ জন। শেষ দিনে দল ও জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় অনেক প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিতে দেরি করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, কয়েকটি বড় জোটের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দরকষাকষি চলছে। এর ফলে কোথাও নতুন মুখ জোটের প্রার্থী তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন, আবার কোথাও দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রার্থীদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে যাওয়ার চিন্তাভাবনাও করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোট রাজনীতির এ ভাঙাগড়া প্রক্রিয়া নির্বাচনের আগে স্বাভাবিক হলেও এবার তা আরও বেশি দৃশ্যমান। শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তগুলো অনেক আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র বদলে দিতে পারে। একইসঙ্গে প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটের সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত মনোনয়ন জমা নিয়ে এ টানাপড়েন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সময়সীমা শেষ হলে কারা মাঠে থাকছেন আর কারা ছিটকে পড়ছেন- সে চিত্রই নির্ধারণ করবে আসন্ন নির্বাচনের প্রকৃত প্রতিযোগিতার রূপ।
এদিকে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সহিংসতা, হত্যা ও অগ্নিসংযোগের ধারাবাহিক ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক বাড়লেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে এখনো কার্যকর কোনো কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে না।
তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর বক্স কালভার্ট রোডে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। দেশে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাদির মৃত্যুর ঘটনার পর প্রতিক্রিয়ায় সারা দেশে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধরা দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালায়। একইসঙ্গে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের হাত থেকে রেহাই পায়নি গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও। দেশের প্রথম সারির দুটি গণমাধ্যম- প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট বিক্ষোভকারীদের হামলার শিকার হয়।
এ ঘটনার বাইরেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় নৃশংস সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। গত কয়েকদিনে লক্ষ্মীপুরে বসতঘরের বাইরে থেকে তালা দিয়ে আগুন লাগিয়ে একটি শিশুকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ময়মনসিংহে এক যুবককে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অঙ্গসংগঠন শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
ক্রমবর্ধমান এসব সহিংস ঘটনায় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভোটের পরিবেশ ও জননিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো কঠোর উদ্যোগ বা সতর্ক বার্তা এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ইসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে, যা নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
তবে আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে গতকাল রোববার চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত সময়সূচি অনুসারে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ওই নির্বাচন পরিচালনার জন্য ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার এবং ৪৯৯ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে আসন্ন গণভোট ও জাতীয় সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্বাচনি এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিধান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের লক্ষ্যে অগ্রিম বাজেট প্রণয়ন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুতকরণ, পোস্টাল ব্যালট পরিবহন ও সংরক্ষণ স্থানের নিরাপত্তা বিধান, ভুল তথ্য ও অপতথ্য বিস্তার রোধ এবং বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের বাংলাদেশে আগমন উপলক্ষে ক্লিয়ারেন্স প্রদান ও তাদের নিরাপত্তার প্রদান, ইত্যাদি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
এতে আরও জানানো হয়, নির্বাচনি দ্রব্যাদি পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণে নিরাপত্তা বিধান, রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় ও মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে ও নির্বাচনের কয়েক দিন আগ থেকে নির্বাচনি এলাকায় সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিতে হবে।
এ ছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দিয়েছে ইসি। নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও আইনানুগ আচরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে। ইতোমধ্যে সংক্রান্ত ডিও লেটার মন্ত্রিপরিষদের সিনিয়র সচিবকে পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, সংশোধিত তফসিলের নির্বাচন সময়সূচি অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আর ভোটগ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি।
কেকে/ আরআই