রাজধানীর গুলিস্তান-বঙ্গবাজার এলাকা যেন দীর্ঘদিন ধরেই একটি অঘোষিত সাম্রাজ্যের অধীনে। অভিযোগ ওঠেছে, গত সাড়ে তিন দশক ধরে এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন মোজাম্মেল হক মজু নামে এক ব্যক্তি। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ফুটপাতে আধিপত্য ও অবৈধ বাণিজ্যের মাধ্যমে শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও কখনোই মজুর প্রভাব কমেনি। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের সভাপতি পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি।
তিনি গুলিস্তান ট্টেট সেন্টারেরও সাবেক সভাপতি ছিলেন বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি—দুই দলের সঙ্গেই সখ্য অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ আফজালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে গুলিস্তান এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন মজু। একই সঙ্গে কৌশলে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের পদও বাগিয়ে নেন তিনি।
তার নিকট এক আত্মীয় বলেন, কাউন্সিলের মাধ্যমে তিনি আহ্বায়ক হয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দল যেই থাকুক, মজু সবসময়ই নিজেকে প্রভাবশালী করে রেখেছেন। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকে আত্মগোপনে গেলেও মজু নতুন কৌশলে আরও সক্রিয় হন।
অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিএনপির কিছু নেতাকে প্রভাবিত করে বর্তমানে ঢাকা ট্রেড সেন্টার ও এনেক্সকো টাওয়ারসহ পুরো গুলিস্তান এলাকায় তার সিন্ডিকেটের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।
প্রতিবাদ করলেই দোকান দখল ও হুমকি :
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মজুর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই দোকান দখল, মারধর এমনকি গুমের হুমকির শিকার হতে হয়। এছাড়াও অবৈধ সম্পদের পাহাড়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদকে দাখিল করা অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের মেয়ে জামাতা এবং তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগী—কেরানি আব্দুর রহমান, জসিম উদ্দিন ও আনোয়ারের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বিশাল কালো সাম্রাজ্য।
মার্কেট সাম্রাজ্য :
ফুলবাড়ীয়া এনেক্সকো টাওয়ারে নামে-বেনামে প্রায় ৩০ কোটি টাকার শেয়ার ও ৫০ কোটি টাকার দোকান। মহানগর কমপ্লেক্স ও সিটি প্লাজায় রয়েছে বিপুল সম্পদ। আবাসিক সম্পদ: যাত্রাবাড়ী, বাগানবাড়ী, সেগুনবাগিচা ও ওয়ারীতে একাধিক ফ্ল্যাট এবং মিরপুর বিজয় রাকিন সিটিতে দুটি বিলাসবহুল বাসা।
গ্রামের প্রাসাদ :
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে এক একর জমিতে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ডুপ্লেক্স বাড়ি।
দোকান জালিয়াতি :
সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের নাম ব্যবহার করে ৩৫০টি অবৈধ দোকান নির্মাণ করে কয়েক শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে দোকান বৈধ করার নামে আরও ২৭ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। বন্ড সুবিধা অপব্যবহার ও সুদের কারবার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্কমুক্ত আমদানির আড়ালে কোটি কোটি টাকার শাড়ি চোরাচালান এবং ফুটপাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চড়া সুদে টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত করাই তার মূল আয়ের উৎস। বক্তব্য দিতে রাজি হননি মজু।
এ বিষয়ে কথা বলতে মোজাম্মেল হক মজুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তার ভাতিজা পরিচয়ে মাহবুবুর রহমান বাবু বলেন, “আমার কাকার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ওঠেছে, তার মধ্যে কিছু সত্য, তবে অধিকাংশই মিথ্যা। দুদক আমাদের ডেকেছিল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমরা জমা দিয়েছি। তিনি রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য।”
মাহবুবুর রহমান দাবি করেন, আমার কাকার বাড়ির প্রকৃত মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেউ কেউ ১০ কোটি বা ৫০ কোটি টাকা বলে অনেকে অভিযোগ করেছে। এছাড়াও তিনি কাউন্সিলের মধ্যেমেই নোয়াখালী রামগঞ্জ উপজেলায় আহ্বায়ক হয়েছেন। এছাড়াও ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্যপদ রয়েছে তার।
গুলিস্তান ফুলবাড়িয়ার নেতারা জানান, মজু একসময়ে ছিলো আওয়ামী লীগের সাংসদের ঘনিষ্ঠ, সে আবার এখন বিএনপির নেতা কিভাবে হল।
কেকে/এমএ