পৌষের কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশার দাপট উপেক্ষা করে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার হাওরগুলোতে বোরো আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। হাড়কাঁপানো শীতেও কাকডাকা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাদা-পানিতে নেমে ধান চাষে মগ্ন তারা।
শীতের তীব্রতায় দিনমজুর কৃষিশ্রমিক ও অটোরিকশা চালকদের দুর্ভোগ বাড়লেও জীবিকার তাগিদে বৈরী আবহাওয়াকে হার মানাতে হচ্ছে সবাইকে। সকাল ১০টার পর কুয়াশা কিছুটা কাটলেও শীতের দাপট কমছে না। তবুও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মাঠে নেমেছেন কৃষকরা।
তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা যায়, প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও কৃষকরা জমি প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত। কেউ বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলছেন, কেউবা সেই চারা আঁটি বেঁধে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছেন মূল জমিতে। ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে মাঠের পর মাঠ, কৃষকদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে আগামীর সোনালি স্বপ্ন।
শীতের কষ্টের কথা জানিয়ে তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের গোবিন্দশ্রী গ্রামের মিল্লাদ হোসেন সাব্বির বলেন, ‘শীত অনেক বেশি, হাত-পা জমে যায়। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তো পেট চলবে না। হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান। সময়মতো চারা রোপণ না করলে ফলন ভালো হবে না, তাই কষ্ট হলেও মাঠে নামতে হচ্ছে।’
ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক নজির হোসেনসহ আরও অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শৈত্যপ্রবাহ চললেও কৃষকদের দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। কারণ বোরো ফসলই এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান ভরসা। এবার অস্বাভাবিক শীত জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
পাটাবুকা গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় মিয়া বলেন, ‘শীত অনেক বেশি, হাত-পা জমে যায়। আমরা পাঁচজন মিলে একটি দল করে চারা রোপণ করি। দিনে দুই কেয়ারের বেশি জমিতে চারা রোপণ করা যায়। এতে জনপ্রতি দৈনিক ৮০০-৯০০ টাকা আয় হয়। আর কয়েক দিন এই কাজ থাকবে, এরপর কাজ না থাকলে আয়ও বন্ধ হয়ে যাবে—তাই এই তীব্র শীত উপেক্ষা করেই মাঠে যাচ্ছি।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, উপজেলার শনি, মাটিয়ান, মহালিয়া, আঙ্গারুলিসহ ২৩টি ছোট-বড় হাওরে সরকারি হিসেবে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে এই পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন জাতের ধানের আবাদ বেশি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তীব্র শীত থাকা সত্ত্বেও কৃষকরা পুরোদমে চারা রোপণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, ‘তীব্র শীতের প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষায় ইতোমধ্যে কিছু কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। দুয়েক দিনের মধ্যে আরও কম্বল বিতরণ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাহিরপুরের কৃষকদের প্রধান সম্পদই হচ্ছে বোরো ফসল। বছরের একমাত্র এই ফসলের ওপর নির্ভর করেই তাদের সারা বছরের খাদ্য, সন্তানের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ চলে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সময়মতো বৃষ্টি ও পোকার আক্রমণ না হলে এবার বাম্পার ফলনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।’
কেকে/এমএ