তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় রাখার লক্ষ্যে বিতর্কিত তিনটি সংসদীয় নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও কিছু গোয়েন্দা সংস্থার অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ‘জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন’ এই প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেছে। প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “ভোট ডাকাতি যেন আর কখনও না ঘটতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”
প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ ও সুপারিশগুলো তুলে ধরেন পাঁচ সদস্যের কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সাবেক গ্রেড-১ কর্মকর্তা শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম। এ সময় আরও বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে’ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি। তবে তিনটি নির্বাচনে অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত থাকায় এবং তদন্ত কমিশনের বরাদ্দ করা সময় অপ্রতুল হওয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে তাদের নাম ও কার কী ভূমিকা ছিল, তা বের করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে ওই নির্বাচন নিয়েও তদন্ত করার সুপারিশ করেছে কমিশন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টিতে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। এটি সারাবিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। প্রশাসনের মধ্যে অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশের বেশি হয়ে যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।’
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’ গঠিত হয়। প্রতিবেদনে কমিশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তদন্তের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন কমিশনের সদস্যরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
কেকে/এলএ