কক্সবাজার জেলা যুবলীগ নেতা আসাদের হাতে আটকে আছে নাইক্ষ্যংছড়ি-গর্জনিয়ার কোটি টাকার এলজিইডির কাজ। ২০২৪ সালে কাজ শুরু করলেও এখনো কাজ শেষ করতে পারেনি। এ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনেরও নেই মাথাব্যথা। অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সড়ক, ব্রিজ কালভার্টসহ বিভিন্ন কাজে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করে আসছিল সাবেক যুবলীগ নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতার মেয়ের জামাই আসাদ উল্লাহ। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়ির সহসভাপতি ও সাবেক চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিমের মেয়ের জামাই ঠিকাদার যুবলীগ নেতা আসাদ উল্লাহ।
তবে দীর্ঘদিন পর হলেও দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের নজরে পড়েছে আলোচিত এই যুবলীগ নেতা। গত স্বৈরাচার আমলে তার বিরুদ্ধে রয়েছে সরকারি কাজ বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। সাবেক সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলের আস্তাভাজন এই যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ থাকলেও কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিগত সরকার পতন আন্দোলনে সরকারের পক্ষ হয়ে মাঠে থেকে ছাত্র-জনতাদের দমাতে টাকাসহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলে খবর রয়েছে।
এদিকে ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতারা আড়ালে চলে গেলেও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিমের মেয়ের জামাই এখনো বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সরকারি বিভিন্ন ঠিকাদারি করে আসছে এমনটা নজরে এসেছে। এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নের সম্মুখিন রাখতে সরকারি বিভিন্ন কাজ ভাল মালামাল দিয়ে না করে দুই নাম্বার জিনিসপত্র ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তার ঠিকাদারি কাজে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী তার অপকর্মের সহযোগী এমন কথাও উঠে আসছে। যা দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন সচেতনমহল।
কক্সবাজার থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে গর্জনিয়া। সেই গর্জনিয়া যেতে হয় পার্বত্য এলাকা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা হয়ে। বছরখানেক আগে নাইক্ষ্যংছড়ি-গর্জনিয়া সড়কের বেহাল দশা হলে স্থানীয় সরকার পরিষদ (এলজিইডি) নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে গর্জনিয়ার বাজার পর্যন্ত দুই দশমিক ৬ কিলোমিটার সড়কটি ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করছিল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আসাদ এন্টারপ্রাইজ। প্রথমে কাজ কিছুটা এগুলেও এখন অর্ধেক কাজ করে ঠিকাদার হাওয়া হয়ে গেছে। কাজ বাকি থাকার কারণে এই সড়কে প্রতিদিন যাতায়াতকারিরা পড়েছে মহা বিপদে। এমন অকেজো সড়কের কারণে যান চলাচল করা বেশ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তার উপর স্কুল ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে বিধায় তাদেরও কষ্টের শেষ নেই। এবার দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের নজরে পড়েছে কক্সবাজারের আলোচিত ঠিকাদার যুবলীগ নেতা আসাদ উল্লাহ। তার বিরুদ্ধে রয়েছে সরকারি কাজ বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ।
সূত্র মতে, এই সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে। এক বছর সময়সীমার এ কাজের মেয়াদ পার হয়েছে ৬ মাস। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে শুধু ১২ শতাংশ। আবার যে কাজগুলো করা হয়েছে তাতেও অনিয়ম রয়েছে, দাবি স্থানীয়দের।
গত বছরের ২৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর রামু উপজেলা কার্যালয়ে অভিযানে যান দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত কক্সবাজার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। সেখান থেকে সরাসরি উপজেলা প্রকৌশলীকে নিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি-গর্জনিয়ার বাজার সড়ক নির্মাণ কাজের অংশে যায় দুদক। সেখানে সড়ক নির্মাণকাজের নানা অসংগতি দেখতে পায় তারা। এই নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী এবং পুরোনো ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ পান দুদকের কর্মকর্তারা। সেখান থেকে নমুনাও সংগ্রহ করেছের তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল হাকিম জানান, বর্তমান সরকারের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই যুবলীগ নেতা কাজ বন্ধ করে রেখেছে যেন সাধারণ মানুষ কষ্ট পায়। নাইক্ষ্যংছড়ি-গর্জনিয়া বাজার সড়কটিতে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। ইতিপূর্বেও কয়েকবার ঠিকাদারকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু তিনি আমাদের কোনো কথায় কর্ণপাত করেননি। গত বছর দুদক পরিদর্শনে এসেছিল। আমরা আশাবাদী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে এখন কাজ বন্ধ থাকায় এই সড়কে যাতায়াতের হাজারো মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল ও কলেজে যেতে কষ্ট পাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ কিভাবে পাওয়া যায় সেই চিন্তা করা উচিত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।
গর্জনিয়ার সেলিম জানান, আমাদের যাতায়াতের একমাত্র সড়ক এটি। অর্ধেক কাজ করে এভাবে ফেলে যাওয়া মোটেও উচিত হয়নি। ঠিকাদারের উচিত কাজ শেষ করে এলাকাবাসীর কষ্ট লাগব করা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রামু কার্যালয়ের উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ কপিল উদ্দিন কবীরের মুঠোফোনে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও তাকে না পাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দুদকের অভিযানে অংশ নেওয়া গণপূর্ত অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘‘যখন গিয়েছিলাম তখন কাজটি চলমান। মাত্র ১২% কাজ শেষ হয়েছে তখন। এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অভিযান চালায়। সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহৃত খোয়া (ইট) আনা হয়েছে। খোয়াগুলো ল্যাবে পরীক্ষার পর অনিয়মের বিষয় নিশ্চিত হওয়া যাবে। এরপর দুদক ব্যবস্থা নিবে।’’
দুদকের সমন্বিত কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক অনিক বড়ুয়া বাবু জানান, ‘‘নাইক্ষ্যংছড়ি-গর্জনিয়া বাজার সড়ক নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পেয়ে দুদক সমন্বিত কার্যালয়ের একটি টিম অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন স্পট পরীক্ষা করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। নির্মিতব্য সড়কের ইটের খোয়া সংগ্রহ করেছি যা ল্যাব টেস্টের জন্য পাঠানো হচ্ছে। পরবর্তীতে ল্যাবের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’’
অন্য একটি সূত্র বলছে, গেল স্বৈরাচার আমলে যুবলীগ নেতা আসাদ উল্লাহ যেইসব প্রকল্পের কাজ করেছেন সকল কাজের নথি দুদক সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তাগাদা দিয়েছেন। সচেতনমহলের মতে, আসাদউল্লাহর পূর্বের কাজের নথি নিয়ে অনুসন্ধান করলে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের সত্যতা মিলবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠিকাদার যুবলীগ নেতা আসাদ উল্লাহর জেলার বিভিন্ন জায়গায় কাজ পেয়েছে তা এখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। তার সব কাজেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বেশিরভাগ সড়ক ও ব্রিজের কাজ অর্ধেক করে ফেলে রেখেছেন আসাদ। উখিয়া উপজেলার হাজিরপাড়া-দোছড়ি সড়কটি কয়েক বছর ধরে ছিল বেহাল অবস্থা। দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর সড়কের কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন টেকেনি। ৫ আগস্টের পর থেকে লাপাত্তা হয়ে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আসাদ এন্টারপ্রাইজ। ফলে মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়া সড়কটি আবারও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে বন্ধ রয়েছে সড়কের কাজ। দুর্ভোগের শেষ নেই সাধারণ মানুষের।
কক্সবাজারের দায়িত্বরত এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সায়েদুজ্জামান জানান, ‘আমরা আসাদ এন্টাপ্রাইজকে অবগত করেছি সড়কটি শিগগির কাজ শেষ করার জন্য। কোনো এক অদৃশ্য কারণে সে কাজ করবে বলে আর কাজ করছে না। যদি সে কাজ না করে তবে আমরা ব্যবস্থা নিব।’
কেকে/এমএ