সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে আইন শিক্ষার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে বিশ্বমানের কারিকুলাম, শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
সম্প্রতি দেশের আইন শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি, সংকট ও সম্ভাবনা, মানোন্নয়নে করণীয় এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খোলা কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) আইন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন। একান্ত এই সাক্ষাৎকারে তিনি আইন শিক্ষার বাস্তব চিত্র, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের পথরেখা তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন খোলা কাগজের ডিআইইউ প্রতিনিধি নাইমুর রহমান ইমন।
খোলা কাগজ : বাংলাদেশে আইন শিক্ষায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : বাংলাদেশে আইন শিক্ষার প্রসার ও বিকাশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমরা গতানুগতিক, তত্ত্বনির্ভর শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক—কোর্টমুখী ও প্র্যাকটিক্যাল ধারার আইন শিক্ষা চালু করেছি।
ওয়ার্কশপ, সেমিনার, মুট কোর্ট, কোর্ট ভিজিট, ক্লিনিক্যাল লিগাল এডুকেশন—এ ধরনের কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রথম ধারাবাহিকভাবে চালু করেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আইন শিক্ষার আধুনিকায়নে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই, কারণ বেশ কিছু ব্যতিক্রম ধর্মী কোর্স সর্বপ্রথম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগগুলোই শুরু করেছে।
খোলা কাগজ : প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শিক্ষার মান নিয়ে যে সমালোচনা রয়েছে সেটিকে কতটা যুক্তিসংগত মনে করেন?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় একই মানের—এটা বলা যাবে না। কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত মানসম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
মান নিয়ন্ত্রণ করা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব—তা সরকারি হোক বা বেসরকারি। যারা মান বজায় রাখতে ব্যর্থ, তাদের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া জরুরি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান শেষ পর্যন্ত প্রতিফলিত হয় শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা, বিচার বিভাগে প্রবেশ, আইন পেশায় সাফল্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতায়।
খোলা কাগজ : ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার মান ও সাফল্য কোন পর্যায়ে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের বয়স প্রায় ৩০ বছর। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা বিচার বিভাগ, আইন পেশা, ব্যাংকিং, কর্পোরেট সেক্টরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলভাবে কাজ করছে—যা বিভাগের মানের প্রমাণ।
আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা। কারিকুলাম নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়, আউটকাম বেসড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলাম চালু রয়েছে। ক্লিনিক্যাল লিগাল এডুকেশন, লিগ্যাল ড্রাফটিং এবং ‘অ্যাডভান্সড ল’ কোর্স বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত। ভর্তি প্রক্রিয়াতেও ন্যূনতম মান বজায় রাখা হয়। সব মিলিয়ে আইন বিভাগ একটি শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
খোলা কাগজ : পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শিক্ষার মূল পার্থক্য কোথায়—শিক্ষক, গবেষণা নাকি একাডেমিক পরিবেশে?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : কারিকুলাম বা শিক্ষকের ক্ষেত্রে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। শিক্ষক নিয়োগে আমরা কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করি। মূল পার্থক্যটা ক্যাম্পাস ও একাডেমিক পরিবেশের পরিসরে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ও সুসংগঠিত ক্যাম্পাস থাকার সুবিধা রয়েছে। তবে একাডেমিক ও কো-কারিকুলার কার্যক্রমের দিক থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে—বিশেষ করে ডিআইইউতে—বছরজুড়ে বিপুল সংখ্যক প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে বেশি।
খোলা কাগজ : প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি ডিগ্রি-কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : ডিগ্রি সব বিশ্ববিদ্যালয়েরই চূড়ান্ত অর্জন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ডিগ্রির সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কী অর্জন করছে? গবেষণা দক্ষতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা, কো-কারিকুলার অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক এক্সপোজার নিশ্চিত করাই আসল বিষয়।
এক্ষেত্রে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা, গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে উচ্চশিক্ষা পূর্ণতা পায় না।
খোলা কাগজ : বার কাউন্সিল পরীক্ষার ফলাফল কি আইন শিক্ষার মান যাচাইয়ের অন্যতম সূচক?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : বার কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, তবে একমাত্র নয়। আইন শিক্ষার্থীদের জন্য বিচার বিভাগ, কর্পোরেট সেক্টর, ব্যাংকিং ও প্রশাসন—এসব ক্ষেত্রও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডিআইইউর শিক্ষার্থীদের বার কাউন্সিল পাসের হার সন্তোষজনক। তবে একজন আইন শিক্ষার্থীর সফলতা শুধু একটি পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত নয়।
খোলা কাগজ : প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও একাডেমিক চর্চার ঘাটতি পূরণে কী করা প্রয়োজন?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্যও গবেষণা ফান্ড থাকা উচিত—নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে।
বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে মানসম্মত আইন শিক্ষা টেকসই হবে না।
খোলা কাগজ : এক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি দায় কার—ইউজিসি, সরকার নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। ইউজিসি, সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মূল্যবোধের জায়গায় এসে দাঁড়ায়।
শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরি নয়; এটি মানুষ গড়ার দায়িত্ব। এই মূল্যবোধ যদি প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে আইন শিক্ষা ডিগ্রি অর্জনের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
খোলা কাগজ : মান নিয়ন্ত্রণ না হলে আইন শিক্ষার সামাজিক গুরুত্ব কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
ড. আবদুল্লাহ আল মনজুর হোসেন : অবশ্যই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মানহীন শিক্ষা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। অযোগ্য মানুষ দিয়ে কোনো সমাজ টেকসইভাবে পরিচালিত হতে পারে না।
আইন শিক্ষার উদ্দেশ সমাজ সংস্কার। মান নিয়ন্ত্রণ না হলে ডিগ্রির মূল্য থাকবে না। তাই কঠোরতা, কার্যকর নজরদারি ও নৈতিকতা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে আইন শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে গুণগত মান, গবেষণা এবং বাস্তবমুখী প্রস্তুতির ওপর। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রয়োজন এখন রাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগ—যাতে আগামী প্রজন্মের আইনজীবীরা শুধু ডিগ্রিধারী নয় বরং দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
কেকে/ আরআই