কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার লক্ষ্যে প্রায় চার বছর আগে প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ এই সময়ে কাগজে-কলমে শয্যার সংখ্যা বাড়লেও বাস্তবে বাড়েনি প্রয়োজনীয় জনবল, বাজেট বা চিকিৎসা সক্ষমতা। ফলে ৩১ শয্যার জন্য নির্ধারিত জনবল দিয়েই বর্তমানে ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিচালিত হচ্ছে। এর পরিণতিতে মেঘনা উপজেলার পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি উপজেলার ইউনিয়নের অন্তত দুই লাখ সাধারণ মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের জুলাই মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য অনুমোদন চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সেই প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি। অথচ অনুমোদন ছাড়াই বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ৫০ শয্যার ভিত্তিতে। ৫০ শয্যা তো দূরের কথা, বিদ্যমান ৩১ শয্যার জন্যও নতুন কোনো চিকিৎসক কিংবা নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে হাসপাতালের আউটডোর বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০–৫০০ রোগী এবং ইনডোরে গড়ে প্রায় ৪০ রোগী চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন।
হাসপাতালটিতে ৩১ শয্যার জন্য ১৬ জন চিকিৎসক অনুমোদিত থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। ফলে অধিকাংশ চিকিৎসকসহ অন্যান্য পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে অফিস সহায়ক, আয়া/ক্লিনার, এম্বুলেন্স ড্রাইভার, স্টোর কিপার, কোষাধ্যক্ষ, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, আবাসিক মেডিকেল অফিসার, সনোলজিস্ট এবং মেডিসিন ও সার্জারী বিভাগের কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বর্তমানে কর্মরত নেই। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির ৭৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৭ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ২১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪ জন। অন্যান্য ক্যাটাগরির পদে কর্মরত আছেন ২৪ জন। সব মিলিয়ে হাসপাতালটির মোট ১০৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৪০ জন, বাকি পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য। এর মধ্যেও ২ জন শিক্ষা ছুটিতে এবং ২ জন মাতৃকালীন ছুটিতে আছেন।
প্রতি মাসে হাসপাতালটিতে শতাধিক স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হলেও তীব্র চিকিৎসক সংকটের কারণে সিজারিয়ান ও অন্যান্য মাইনর অপারেশন প্রায়ই সীমিত পরিসরে করতে হচ্ছে। এতে প্রসূতি নারী ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জীবনঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। অনেক রোগী বাধ্য হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা অন্যত্র রেফার হতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া ৩১ শয্যার জন্য নির্ধারিত খাদ্য বরাদ্দ দিয়েই ৫০ শয্যার রোগীদের খাবার সরবরাহ করায় খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়েও রোগীর স্বজনদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা বড় সাপমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আওলাদ হোসেন বলেন, “স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য একদিন সকালে এসে আমাকে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে ডাক্তার অন্য রোগীদের দেখাশুনা শেষ করে এসে আমার রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করান। ডাক্তার সংকটের কারণে রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়মা রহমান খোলা কাগজকে বলেন, “উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পর্যাপ্ত না থাকায় জরুরি বিভাগে বহিরাগত রোগীদের সন্তোষজনক সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক সময় রোগীরা আমাদের ভুল বুঝে থাকেন। এছাড়াও আউটসোর্সিং কর্মীদের দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বেতন দিতে পারছি না, সেজন্য হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। তবে জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও সীমিত সক্ষমতা নিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য পদে জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও শয্যা উন্নীতকরণের অনুমোদন পাওয়া গেলে চিকিৎসা সেবার মান আরও উন্নত হবে।”
কেকে/এলএ