আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা কেন্দ্রসমূহে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের দায়িত্ব পেয়েছেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতা। এ নিয়ে এলাকায় চলছে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনা।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সারা দেশে ২১ হাজার ৯৪৬টি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ৭১ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় সিসিটিভি ক্যামেরার স্থাপনের দায়িত্ব পেয়েছেন শহিদুল ইসলাম কাইসার নামে এক ছাত্রলীগ নেতা। তার বড় ভাই যুবলীগ নেতা সেলিম উদ্দিন পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর ডান হাত নামে পরিচিত।
একজন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ভোট কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করলে তা কতটুকু নিরাপদ হবে তা জানতে চাইলে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উনি ছাত্রলীগ করতেন সেটা আমার জানা ছিল না। আপনাদের কাছ থেকে প্রথম শুনেছি। তবে পার্শ্ববর্তী সাতকানিয়া উপজেলায় উনি কাজ করেছেন তাই আমিও ওনাকেই দিয়েছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিষয়টা যদি আরো আগে জানতাম তাহলে ব্যাবস্থা নিতে পারতাম। কিন্ত এমন একটা সময়ে জাতে পরেছি যখন কিছুই করা সম্ভব না। তবে আমাদের অনেক ভাল সিকিউরিটি টিম আছে। সুতরাং কোনো সমস্যা হবে না।’
এদিকে সরকার এখনও যেখানে সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি ভোট কেন্দ্রমুখি করে তুলতে পারেনি সেখানে তাদের মাঝে এমন একটা খবর ছড়িয়ে পড়লে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন, প্রশাসনে যারা কাজ করে তাদের আরো সচেতন হওয়া দরকার। যেহেতু আমরা এখনও স্বৈরাচারকে স্বমূলে উৎখাত করতে পারিনি সেহেতু সরকারি যেকোনো কাজে আরো অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কেননা আওয়ামী লীগ অপেক্ষায় আছে যেকোনো সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য।
অনুসন্ধানে সেই নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ। লোহাগাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেসব ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার কথা তা দুই বছরেও ৩০ শতাংশ কাজ হয়নি।
দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অপটিক্যাল ফাইবার ব্রডব্যান্ড কানেকশন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ৩৬টি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) বিদ্যালয়গুলোয় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের দ্বায়িত্ব পেয়েছিল। কিন্তু লোহাগাড়ার প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যালয়ে ব্রডব্যান্ড সংযোগের রাউটারটিও পৌঁছায়নি। এমনকি আশ্চর্যজনকভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিজেই জানেন না ইতোমধ্যে কয়টি বিদ্যালয়ের জন্য ব্রডব্যান্ড সংযোগের বরাদ্দ এসেছে এবং কয়টিতে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কিছু বিদ্যালয়ে এখনও শুধুমাত্র রাউটার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সংযোগ দেওয়া হয়নি আবার বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে কিছুই দেওয়া হয়নি। মহাসড়কের আশেপাশে থাকা অধিকাংশ বিদ্যালয়েই অচল রয়েছে সংযোগ।
শিক্ষকরা জানান, সংযোগ সচল করে দেওয়ার জন্য বারবার কল করা হলে দেওয়া হয় শিক্ষকের চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকি। বলা হয় বিভিন্ন দপ্তরের উপর মহলে তার পরিচয় রয়েছে।
চরম্বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, আমাদের সংযোগ একবার চালু করে দিয়েছিল কিন্তু কিছুদিন পরই আবার রাউটার নিয়ে যায় সে। যাওয়ার সময় বলেছিল, দশ মিনিট পর এনে দিবেন কিন্তু আমরা দিনের পর দিন কল দিয়ে প্রায় ২ মাস পর সেই রাউটার ফেরত পেয়েছি। বেশি কল দেওয়ার কারণে উনি আমাদের চাকরিও খেয়ে ফেলার হুমকি দেন। উনার নাকি হাত অনেক লম্বা।
পদুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, আমাদের অনেক আগে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়া হয়েছে কিন্তু এটা থাকা আর না থাকা সমান। একদিন ঠিক থাকলেও তিনদিন থাকেনা। প্রাতিষ্ঠানিক কাজ সারতে বাধ্য হয়ে মোবাইলে এমবি কিনে ডেটা ব্যবহার করছি।
চরম্বা মাইজবিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষিকা বলেন, আমরা এখনও কিছুই পাইনি। একবার দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দেওয়ার পর আমি যে বুঝে পেয়েছি সেটার একটা স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে আবার সব সামগ্রী নিয়ে যায় তারা।
যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা শহিদ জানান,তাকে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিসি ক্যামেরা বসানোর দায়িত্ব দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-১৫ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী প্রধান সমন্বয়ক আসহাব উদ্দিন চৌধুরী লেন, ‘এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তাকে সরিয়ে অন্যজনকে দায়িত্ব দেওয়া হোক।’
চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বিষয়টি আপনার কাছ থেকে জানলাম। যদি এটি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই উদ্বেগের। আমরা এটি প্রশাসনকে অবহিত করবো।
কেকে/ এমএস