অপহরণ চক্রের কাছে অসহায় কক্সবাজারের টেকনাফের তিন ইউনিয়নের পাহাড়ি অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ। জীবিকার তাগিদে চাষাবাদ কিংবা পাহাড়ে গেলেই অস্ত্রের মুখে পাহাড়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে অপহরণ চক্র। প্রশাসন বা আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীকে অভিযোগ করলেই মুক্তিপণের টাকা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয় হত্যার হুমকিও। এদিকে এখনো হদিস মেলেনি অপহৃত ৬ কৃষকের। তবে তাদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কক্সবাজারের টেকনাফে হোয়াইক্যং মিনাবাজার পাহাড়ি অঞ্চল। স্থানীয়রা জানায়, ছয় কৃষক গিয়েছিলেন কৃষি কাজ ও কাঠ সংগ্রহ করতে। কিন্তু গত মঙ্গলবার সকালে তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পাহাড়ে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। এ ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে টেকনাফের হোয়াইক্যং মিনাবাজার বাজার কোনাপাড়া এলাকায়। অনেকেই যাচ্ছে না কৃষি কাজে বা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, একদিকে নাফ নদীতে আরাকান আর্মি ভয় অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে অপহরণকারীদের ভয়। আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের আয়ের উৎস। মিনাবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম (৫০) বলেন, ‘ছয়জনকে ধরে নিয়ে গেছে পাহাড়ে। অনেকক্ষণ কোনো খবর ছিল না। পরে দুপুরে মোবাইলে জানানোর পর বলতে পারে তাদের অপহরণ করা হয়েছে।’ একই এলাকার সরওয়ার কামাল (৪৫) বলেন, ‘অপহরণকারীরা প্রথমে ৩ লাখ টাকা দাবি করেছিল। কিন্তু রাতে পুলিশ প্রশাসন যাওয়ার পর এখন অপহরণকারীরা দাবি করছে ৮ লাখ টাকা। প্রশাসনকে জানালেও মুক্তিপণের টাকা আরও বাড়বে এখন এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। মুক্তিপণের টাকা না দিলে হত্যা হুমকিও দিচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফুর (৫৫) বলেন, ‘এখানে আমরা সবাই অসহায় মানুষ। জমিতে কোনোরকম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু এখন অপহরণ চক্রের কারণে অনেক কৃষি জমি চাষ ছাড়া পড়ে আছে। অপহরণ চক্রের কাছে আমরা অসহায়। এদিকে আরাকান আর্মি ভয়ে নাফ নদীতেও মাছ ধরতে যেতে পারি না। আমাদের আয়ের সবপথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা, বাহারছড়া ও হোয়াইক্যং ইউনিয়ন। যার পাহাড়ি অঞ্চলগুলো অনেকটায় দুর্গম। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করাটাও অনেক দুষ্কর হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। মিনাবাজার এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন (৬০) বলেন, টেকনাফ বা হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পুলিশ যেতে যেতে অনেক সময় লাগে। ততক্ষণে অপহরণকারী চক্র কৃষকদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এই সমস্যায় রয়েছি। এখন অপহরণকারী চক্রের হাত থেকে আমাদের বাঁচাতে অন্তত পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর পাশে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, কৃষক পরিবারগুলোর কাছ থেকে কোন ধরনের অভিযোগ আসেনি। তারপরও খবর পেয়ে অপহরণকারীদের ধরতে এবং অপহৃতদের উদ্ধারে সমন্বয় করে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে বছরজুড়েই লেগে আছে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অপহরণের ঘটনা। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে এই অপহরণ বেড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাদের ভিড়ে স্থানীয় কিছু সংখ্যক লোকজন এখন অসহায় দিন যাপন করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান-গ্রেপ্তারেও অপহরণের ঘটনা বন্ধ করা যাচ্ছে না।
জানা যায়, বর্তমানে এখানকার মানুষের দিন কাটছে মানবপাচার, অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যের ভয়ে। গেল এক বছরে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হয়েছেন সাড়ে তিনশো জনের কাছাকাছি। আর পাচার হয়েছেন ৭ শতাধিক। আর টেকনাফ থানায় অপহরণ ও মানবপাচার মামলা হয়েছে গেল ৬ মাসে ৪০ এর অধিক।
তবে এখানেই শেষ নয়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক অজানা চিত্র। এসব পাচারকার্যে জড়িত স্থানীয় কিছু দালালচক্র। তাদের কবলে স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পর্যটক ছাড়া পাচার ও অপহরণের শিকার হয়েছেন রোহিঙ্গা নাগরিকও। অধিকাংশই মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন ভুক্তভোগীদের পরিবার সূত্রে জানা যায়। তবে যারা মুক্তিপণ দিতে পারেনি, তাদের অনেককে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া সাগর পথে পাচার করে দেওয়া হয়েছে।
অভিনব কৌশলে কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। এই অপহরণ-বাণিজ্য ঘিরে সক্রিয় অন্তত ১০ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। অপহরণের পর টেকনাফের পাহাড়-জঙ্গলের আস্তানায় নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করছে তারা। টেকনাফের বাহারছাড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নে অপহরণ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। একের পর এক ঘটনা ঘটলেও কারা অপহরণে জড়িত তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে অপহরণকারীরা। অপহরণের পর মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। ফেরত আসা ব্যক্তিরা প্রাণনাশের ভয়ে অপহরণকারীদের সম্পর্কে কিছু বলছেন না। অপহরণে জড়িত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গত ৮ জানুয়ারি সকালে হ্নীলা ইউনিয়নের লেচুয়াপ্রাং এলাকা থেকে চার কৃষককে অপহরণ করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।
তারা হলেন—লেচুয়াপ্রাং গ্রামের আবদুস সালাম, আবদুর রহমান এবং দুই ভাই মুহিব উল্লাহ ও আবদুল হাকিম। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাতে হ্নীলা পাহাড়ি এলাকা থেকে তিন জন ছয় লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন। গত ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আবদুস সালাম ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আবদুস সালামের পরিবার। এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর বিকালে টেকনাফের জাহাজপুরা পাহাড়ের খালে মাছ ধরতে গেলে কলেজশিক্ষার্থীসহ আটজনকে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে যায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। পরে নির্যাতনের শিকার হয়ে তিন দিন পর ছয় লাখ ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান তারা।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় অপহরণকারীরা সহজেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং সেই সুযোগটাই তারা কাজে লাগাচ্ছে। সম্প্রতি ছয়জন অপহৃত হওয়ার বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। তবে এখনো পর্যন্ত এ ঘটনায় কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ বা এজাহার দায়ের করেননি। তা সত্ত্বেও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছে। অপহরণকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা এবং অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারের জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
কেকে/এজে