বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে শপথ পাঠ করান। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নতুন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের পর্যায়ক্রমে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি। এর মধ্যদিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচিত সরকারের যাত্রা শুরু হলো। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, প্রধান বিচারপতি, দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
সকাল থেকেই সংসদ ভবন এলাকা উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যরা সকালে শপথ নেওয়ার পর থেকেই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজাজুড়ে শুরু হয় সাজ সাজ রব। কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে পুরো প্রাঙ্গণ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে তাদের শপথ পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তবে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত দলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে একটি নির্দেশনা দেন। নির্দেশনায় তিনি জানিয়ে দেন, তারা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের ফরম যুক্ত হলে, কে এই শপথ পড়াবেন তা নির্ধারিত হলে, তখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যাবে। তিনি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে সহকর্মীদের জানান।
অপরদিকে মঙ্গলবার সকালে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছিলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না। কারণ তারা মনে করেন, সংস্কারবিহীন সংসদ অর্থহীন।
তবে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের পর জরুরি বৈঠকে বসেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোটের নেতারা। এরপর তারা বৈঠক থেকে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য দুটোতেই শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর জামায়াতে ইসলামী থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। একইসঙ্গে তাদের সঙ্গে শপথ নেন স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।
তবে ঢাকা ৬ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন দেরিতে উপস্থিত হওয়ায় তাদের সঙ্গে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তাদের শপথ পাঠ করান সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা এবং বিএনপির এমপি ইশরাক হোসেন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়েই অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
এরপর এনসিপির ছয়জন নির্বাচিত এমপিও শপথ নেন। এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন তারা। তাদের শপথবাক্য পাঠ করান সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন।
পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন যারা :
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়), আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (অর্থ ও পরিকল্পনা), সালাহউদ্দিন আহমদ (স্বরাষ্ট্র), ইকবাল হাসান মাহমুদ (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ), হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক), আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন (মহিলা ও শিশুবিষয়ক, সমাজকল্যাণ), আব্দুল আউয়াল মিন্টু (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (ধর্মবিষয়ক), মিজানুর রহমান মিনু (ভূমি), নিতাই রায় চৌধুরী (সংস্কৃতিবিষয়ক), খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; শিল্প মন্ত্রণালয়; বস্ত্র ও পাট), আরিফুল হক চৌধুরী (শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান), জহির উদ্দিন স্বপন (তথ্য ও সম্প্রচার), আফরোজা খানম রিতা (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন), মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি (পানিসম্পদ), আসাদুল হাবিব দুলু (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ), মো. আসাদুজ্জামান (আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক), জাকারিয়া তাহের (গৃহায়ণ ও গণপূর্ত), দীপেন দেওয়ান (পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক), আ ন ম এহসানুল হক মিলন (শিক্ষা মন্ত্রণালয়; প্রাথমিক ও গণশিক্ষা), সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ), ফকির মাহবুব আনাম (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি), শেখ রবিউল আলম (সড়ক পরিবহন ও সেতু)। টেকনোক্র্যাট : ড. খলিলুর রহমান (পররাষ্ট্র), মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ (কৃষি; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, খাদ্য)।
প্রতিমন্ত্রী হলেন যারা :
এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন), অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ), মো. শরিফুল আলম (বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট), শামা ওবায়েদ ইসলাম (পররাষ্ট্র), সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, খাদ্য), ব্যারিস্টার কায়সার কামাল (ভূমি), ফরহাদ হোসেন আজাদ (পানিসম্পদ), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক), হাবিবুর রশিদ (সড়ক পরিবহন ও সেতু), মো. রাজিব আহসান (রেলপথ, নৌ-পরিবহন), মো. আব্দুল বারী (জনপ্রশাসন), মীর শাহে আলম (স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়), মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (অর্থ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র), ইশরাক হোসেন (মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক), ফারজানা শারমীন (মহিলা ও শিশুবিষয়ক, সমাজকল্যাণ), শেখ ফরিদুল ইসলাম (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, ধর্মবিষয়ক, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক), মো. নুরুল হক নুর (শ্রম ও কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান), ইয়াসের খান চৌধুরী (তথ্য ও সম্প্রচার), এম ইকবাল হোসেইন (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ), এম এ মুহিত (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি), আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর (গৃহায়ন ও গণপূর্ত), ববি হাজ্জাজ (শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা), আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম (সংস্কৃতিবিষয়ক)। টেকনোক্র্যাট : মো. আমিনুল হক (যুব ও ক্রীড়া)।
ঐতিহ্য ভেঙে সংসদ প্রাঙ্গণে নতুন সরকারের শপথ :
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রচলিত রীতি ভেঙে এবার নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্লাজায়। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রীয় শপথ অনুষ্ঠান সাধারণত রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। সেই ধারার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে এবার উন্মুক্ত স্থানে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনকে সরকার পক্ষ নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি আরও গণমুখী ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত স্থানে বড় স্ক্রিনে শপথ অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
নির্বাসন থেকে ফিরে সরকারপ্রধান :
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই প্রথম জাতীয় নির্বাচনেই বড় জয় এনে ইতিহাস গড়েছেন। নিজে দুটি আসনে জয়ী হওয়ার পাশাপাশি তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে।
এর আগে রাজনৈতিক অনৈক্যের কারণে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় রিমান্ডের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং কারাবাসের কারণে তার স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তিনি লন্ডনে যান, যা পরে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে দীর্ঘ নির্বাসনের শুরু। এরপর একের পর এক মামলা, দণ্ডাদেশ এবং দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা তাকে কার্যত নির্বাসিত জীবনে ঠেলে দেয়। তবুও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাননি তিনি।
২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তিনি। লন্ডনে বসেই ভার্চুয়াল সভা, বক্তব্য ও সাংগঠনিক নির্দেশনার মাধ্যমে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যান। সেই সময় টানা ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার, এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরিবর্তিত বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে আসে মোড়।
প্রায় ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। সেদিন রাজধানীতে লাখো মানুষের ঢল যেন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, দীর্ঘ নির্বাসনের অধ্যায় শেষ হয়ে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান তার মা খালেদা জিয়া। ব্যক্তিগত শোক আর রাজনৈতিক দায়িত্ব, এই দুই ভার একসঙ্গে নিয়েই তিনি সামনে এগিয়ে যান।
এরপর দল পুনর্গঠন, প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে জোট বিস্তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সিদ্ধান্তে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি অংশ নেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ফলাফল আসে ভূমিধস বিজয়। ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টিতে জয় পেয়ে বিএনপি জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। পরে দল ও জোটের সিদ্ধান্তে তারেক রহমান সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
কেকে/এমএ