ইসলামে আত্মহত্যা (নিজেকে হত্যা করা) একটি মহাপাপ হিসেবে বিবেচিত। তবে কোনো ব্যক্তি জান্নাতে যাবে নাকি জাহান্নামে—এই চূড়ান্ত ফয়সালা মানুষের কাজ নয়; এটি একমাত্র আল্লাহর অধিকার।
প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় আত্মহত্যার খবর চোখে পড়ে। কখনও শিক্ষার্থী, কখনও গৃহিণী, কখনও কর্মজীবী মানুষ—জীবনের নানা স্তরে ছড়িয়ে আছে এই বেদনাদায়ক প্রবণতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কী শুধু খবরটি পড়ে ক্ষণিকের দুঃখ প্রকাশ করব, নাকি এর কারণ ও প্রতিকার নিয়েও ভাবব?
ইসলামে আত্মহত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল-কুরআন-এ স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু’ (সূরা নিসা ৪:২৯)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আত্মহত্যা সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি যে পদ্ধতিতে আত্মহত্যা করবে, তাকে আখিরাতে সেই পদ্ধতিতেই শাস্তি ভোগ করতে হবে’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী—এমন ফয়সালা মানুষ দিয়ে দিবে। ইসলামের আকীদা অনুযায়ী—
১. কোনো মুসলিম বড় গুনাহ করলেও সে ঈমানচ্যুত হয়ে যায় না।
২. আল্লাহ চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন, আবার তাঁর অসীম রহমতে ক্ষমাও করতে পারেন।
৩. চূড়ান্ত বিচার একমাত্র আল্লাহর হাতে।
৪. তাই কাউকে নিশ্চিতভাবে জান্নাতি বা জাহান্নামী বলা সমীচীন নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন—আত্মহত্যার পেছনে প্রায়ই থাকে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সামাজিক চাপ, পারিবারিক সহিংসতা, আর্থিক সংকট কিংবা সম্পর্কের ভাঙন একজন মানুষকে হতাশার গভীরে ঠেলে দিতে পারে। অনেক সময় সে সাহায্যের হাত খোঁজে, কিন্তু লজ্জা, ভয় বা অবহেলার কারণে সেই সহায়তা আর পৌঁছায় না।
আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও সংবেদনশীলতা জরুরি। ঘটনার বর্ণনায় অতিরঞ্জন না করে সচেতনতার বার্তা দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে কোথায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায়, সে তথ্য যুক্ত করা দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও সতর্ক হতে হবে। আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত নীরবতা, একাকিত্ব বা হতাশার লক্ষণ—এসবকে অবহেলা করা উচিত নয়। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলার চেয়ে ‘তুমি কী অনুভব করছ?’—এই প্রশ্নটি অনেক বেশি কার্যকর।
আমাদের সমাজে এখনো মানসিক চিকিৎসা নেওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। এই ভুল ধারণা বদলাতে হবে। যেমন শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসা নেওয়া স্বাভাবিক, তেমনি মানসিক কষ্টেও পেশাদার সহায়তা নেওয়া জরুরি।
অনেক সময় মানুষ অসহনীয় মানসিক কষ্ট বা অসুস্থতার প্রভাবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়। ইসলাম দয়া, সহমর্মিতা ও চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেয়। তাই আত্মহত্যায় কারও মৃত্যু হলে তাকে নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য না করে বরং তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করাই উত্তম।
আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তির একক ব্যর্থতা নয়; এটি সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। শাস্তির ভয় নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা—যেখানে মানুষ সংকটে পড়ে একা অনুভব করবে না। একটি মানবিক সমাজই পারে বহু অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করতে।
কেকে/এসএ