৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’কে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দিবসটি সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্য, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক গোষ্ঠী, উগ্রবাদী চক্র এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের অপতৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারও সম্ভাব্য যে কোনো নাশকতা, বিশৃঙ্খলা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রেখেছে।
এই উত্তেজনার অন্যতম বড় বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় গত রোববার রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশনে অনুষ্ঠিত জুলাই রেভ্যুলেশনারি অ্যালায়েন্সের (জেআরএ) ‘জুলাই বিপ্লববিষয়ক প্রথম সম্মেলনে’। সম্মেলনে মাহদী আমিন বক্তব্য শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা একযোগে সেøাগান দিতে থাকেন। তাদের মূল দাবি ছিল দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর এবং জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা।
দীর্ঘ সময় ধরে সভাকক্ষে হট্টগোল চলতে থাকে। আয়োজকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও ক্ষুব্ধ অংশগ্রহণকারীরা শান্ত হননি। উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী মঞ্চে উঠে উপস্থিত সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে বক্তৃতা শেষ করে মঞ্চ ছাড়তে গেলে বিক্ষোভকারীরা তার পথরোধ করেন। পরে তিনি আবার মঞ্চে ফিরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে বক্তব্য দেন।
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জাহাঙ্গীর হোসেনের ওপর হামলার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারা এ হামলার পেছনে, এর উদ্দেশ্য কী এবং এটি কোনো বৃহত্তর অস্থিতিশীলতার অংশ কিনা, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিবসকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনা অনেক সময় ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বিঘ্ন এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সারা দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে এর প্রভাব পড়ছে। এ বাস্তব পরিস্থিতিকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একটি অসাধু চক্র বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব ও অপপ্রচার ছড়িয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করে জনঅসন্তোষ উসকে দেওয়ার লক্ষ্যেই এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
গতকাল সোমবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিবিএল গ্রুপের সব পোশাক কারখানা বন্ধ এবং প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের চাকরি অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। তবে পরে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে তাদের সব কারখানা বন্ধ রয়েছে বলে যে খবর প্রচারিত হয়েছে, তা সঠিক নয়।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, সম্প্রতি কিছু গণমাধ্যম, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে ডিবিএল গ্রুপসহ একাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের তথ্য সম্পূর্ণ ভুল, বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন। এ ধরনের সংবাদ সংশ্লিষ্ট মহলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।
সংগঠনটি জানায়, আগামী ৫ আগস্টের সরকারি ছুটি এবং সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে অনেক কারখানা বৃহস্পতিবার ছুটি দিচ্ছে। পরবর্তীতে শ্রম আইন ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী এই কর্মঘণ্টা সমন্বয় করা হবে। শিল্প খাতে গ্যাস সংকটের সময়ে এ ধরনের সমন্বয় একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে কারখানা স্থায়িভাবে বন্ধ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
বিজিএমইএর নেতারা বলেন, যথাযথ যাচাই ছাড়া কারখানা বন্ধের মতো স্পর্শকাতর সংবাদ প্রকাশ হলে দেশি-বিদেশি ক্রেতা, ব্র্যান্ড ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে অযাচিত উদ্বেগ তৈরি হয়। এতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অর্জিত সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাদের মতে, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য পুরো শিল্প খাতের পাশাপাশি এর ওপর নির্ভরশীল লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের বৃহত্তম নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নিশ্চিত করেন, গ্যাস সংকটের কারণে ডিবিএল গ্রুপের সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সংবাদটি সঠিক নয়।
ডিবিএল এক বার্তায় জানায়, আগামী ৫ আগস্ট সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি উপলক্ষে কেবলমাত্র আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) বিভাগে তিন দিনের একটি সংযুক্ত (ব্রিজ) ছুটি পালিত হচ্ছে। এই ছুটি আমাদের কর্মীদের অনুরোধের ভিত্তিতে প্রদান করা হয়েছে এবং মাঝের কর্মদিবসটি পরবর্তী একটি কর্মদিবসে সমন্বয় করা হবে, ফলে নির্ধারিত উৎপাদনে কোনো ঘাটতি হবে না। এই ছুটি শুধু আরএমজি বিভাগের জন্য প্রযোজ্য। ডিবিএল গ্রুপের অন্যান্য সকল বিভাগ, প্রতিষ্ঠান ও ভার্টিক্যাল স্বাভাবিক নিয়মে, কোনো বিঘ্ন ছাড়াই কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
পাশাপাশি, দেশব্যাপী সামগ্রিক শিল্প খাতের মতোই, বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে আমাদের কিছু কার্যক্রম বর্তমানে সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। আমরা বিষয়টি সক্রিয়ভাবে ব্যবস্থাপনা করছি এবং আমাদের ক্রেতা, অংশীদার ও কর্মীদের প্রতি সকল প্রতিশ্রুতি পূরণে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট বাস্তব হলেও কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তা শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প খাত ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও নেতিবাচক বার্তা যায়। ফলে অর্থনৈতিক ইস্যুকেও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বড় তৎপরতা চালানোর সক্ষমতা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেই।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দলটির অধিকাংশ নেতাকর্মী বিদেশে অবস্থান করছেন এবং মাঝেমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, উগ্রবাদী গোষ্ঠী কিংবা সন্ত্রাসীরা যাতে কোনোভাবেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব সম্প্রচার এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে সমর্থকদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে। ৫ আগস্টকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৎপরতা বেড়েছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তিকর দাবি ও গুজব ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা চলছে।
বিশেষ করে পুরোনো ছবি বা ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার, যাচাইবিহীন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং উসকানিমূলক প্রচারণার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার অপচেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টকে ঘিরে সরকারের সামনে অন্তত চারটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। দ্বিতীয়ত, জুলাই আন্দোলনের আহত ব্যক্তি, শহীদ পরিবার এবং আন্দোলনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের প্রত্যাশা ও দাবির বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি দেখানো। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার মোকাবিলা করা। চতুর্থত, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ যেন রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে কার্যকর বার্তা ও বাস্তব পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।
কেকে/এলএ