ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের। এর তিন দিন পর, ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরশাসনে পিষ্ট জনগণ নতুন সরকারের অভিষেকে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। এই সরকারকে ঘিরে জনপ্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠন করে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে মেয়াদ সম্পন্ন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এখন চলছে বিগত সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব। আলোচনায় উঠে আসছে সাবেক উপদেষ্টাদের অনিয়মের খতিয়ানও।
বিশেষ করে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা যেভাবে নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করে বিশেষ নিরাপত্তা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, তা দেশজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। সব মিলিয়ে বিতর্ক ও দুর্নীতির কালো দাগ লেগেছে সাবেক উপদেষ্টা পরিষদেও।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে ড. ইউনূসের ভিআইপি প্রটোকল
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তার দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে দায়িত্ব-পরবর্তী সময়েও তিনি বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকবেন। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব (বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত) মো. সাইফুল্লা পান্নার স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনটি গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়। তবে সেটি জনসমক্ষে আসে সম্প্রতি।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকার বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইনের ক্ষমতাবলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তার দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করতে গিয়ে অসততার আশ্রয় নিয়েছেন— এমন অভিযোগ উঠেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে। তিনি যে অধ্যাদেশটি অতি গোপনীয়ভাবে জারি করেছেন, তা ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবরের এসআরও নং ২৮৫ সংশোধন করে করা হয়েছে। ওই আদেশে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে স্ব স্ব পদে কর্মবসানের তারিখ থেকে এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সর্বোচ্চ তিন মাস ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
অভিযোগ রয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই আদেশের আলোকে শুধু নিজের জন্য এক বছরের জন্য ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন; কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সময়সীমা বৃদ্ধি করেননি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তির জন্য আইন পরিবর্তন বা প্রণয়ন করা যায় না। ১০ ফেব্রুয়ারি অতি গোপনীয়ভাবে জারি করা অধ্যাদেশটি একদিকে যেমন সংবিধানের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন, তেমনি এটি ড. ইউনূসের স্বার্থপরতার উদাহরণ বলেও দাবি করা হচ্ছে।
তারা বলেন, তিনি যদি বিদায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং আগের আইনে বর্ণিত অন্যদের জন্যও সময়সীমা বাড়াতেন, তাহলে এর যৌক্তিকতা কিছুটা বোঝা যেত। কিন্তু শুধু নিজের জন্য এক বছরের মেয়াদ নির্ধারণ অনৈতিক এবং সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন— এমন মত তাদের।
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করিয়েছেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফ করেছেন। ক্ষমতায় থাকাকালে নিজের নামে বিশ্ববিদ্যালয় ও রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিদায়ের আগেও নিজের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন— এমন অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শতাধিক দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগের তালিকায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার নাম রয়েছে।
দুদকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যে হারে অভিযোগ আসছে, তাতে অভিযোগের রেকর্ড হতে পারে। অধিকাংশ অভিযোগে অভিযোগকারীরা নাম প্রকাশ করেননি; তবে কয়েকটি অভিযোগে নাম-পরিচয়সহ লিখিত চিঠি দেওয়া হয়েছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, অন্যান্য অভিযোগের মতোই এগুলোও যাচাই-বাছাই করা হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের অভিযোগ উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ড. ইউনূস নিজের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করে গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, আয়কর ফাঁকি ও অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে তিনি ওই ট্রাস্ট গঠন করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ট্রাস্টটির মূল উদ্দেশ্য তার পরিবারের দেখাশোনা করা এবং এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দায়িত্ব পালনকালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন— এমন অভিযোগও উঠেছে।
সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের এক ডজনের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে মামলাবাণিজ্য, জামিনবাণিজ্য, বিচারক পদায়ন-সংক্রান্ত অনিয়ম ইত্যাদি। একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি জামিনবাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এ ছাড়া পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিচারক বদলিতে ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে। সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে অন্তত আটটি অভিযোগ জমা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধেও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধেও টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে।
দুদক জানিয়েছে, অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে।
কেকে/এলএ