২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। গতকাল ১৭ আগস্ট সরকারের প্রথম ১৮০ দিন পূর্ণ হয়। এ সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, কৃষির পুনরুজ্জীবন, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সরকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জনগণের আকাক্সক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরিতে গত ছয় মাসে কাজ করা হয়েছে। জনগণকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে একটি মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই আগামী দিনের পথচলা অব্যাহত রাখবে সরকার।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে গতকাল সোমবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মেলন কেন্দ্র ‘শাপলা’য় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে গত ছয় মাসে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ, অগ্রগতি ও অর্জনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।
মাহ্দী আমিন বলেন, বিএনপির ঐতিহাসিক ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০, তারেক রহমানের ২৭ দফা, যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের ৩১ দফা এবং জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে প্রণীত নির্বাচনি ইশতেহারের ভিত্তিতে সরকার দেশ পরিচালনা করছে। ভোটের পর হাতের কালি শুকানোর আগেই ইশতেহারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়। জুলাই সনদের অঙ্গীকারও বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভিআইপি সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসেছেন। তিনি বারবার তৃণমূলে ছুটে যাচ্ছেন, কোদাল হাতে খাল খননে নেমে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ এমন একটি সরকার পেয়েছে, যাকে তারা আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে ধারণ করে।
উপদেষ্টা বলেন, ‘গত ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখেছি। একটি বারের জন্য কখনো কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন ঘটেনি।
ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির অবসানের উদ্যোগ
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে রাজনৈতিক সংস্কারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে সহনশীলতার রাজনীতির ওপর জোর দিয়েছেন। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করে প্রধানমন্ত্রী তার মাসিক মূল বেতনের ১০ শতাংশ (১১,৫০০ টাকা) রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিচ্ছেন, সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার-ফেস্টুনে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। অপচয় কমানো, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং মন্ত্রীদের প্রটোকল কমানোর মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে জনমুখী নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ‘জীবনবান্ধব’ বাজেট ও ৩ আর কৌশল
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে ‘৩ আর’ কৌশল গ্রহণ করেছে। রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশনকে ভিত্তি করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ‘জীবনবাস্তব বাজেট’ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে এবং ১২ আগস্ট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬১টি পণ্যে কর ও শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার সংস্কারেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। পুঁজিবাজারে ১৭ দফা কর্মপরিকল্পনা, এআইভিত্তিক নজরদারি এবং ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাত সংস্কারে বিশ্বব্যাংক ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়িক অনুমোদনের সময় ১৪ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন, বন্ধ পাটকল পুনরায় চালু এবং নীল অর্থনীতির বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তায় বিস্তৃত সরকারি সহায়তা
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে দরিদ্র, নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবারভিত্তিক সহায়তা, কৃষক ও প্রবাসীদের সেবা, শহীদ-আহত পরিবারের পুনর্বাসন এবং শিক্ষা-খাদ্য সহায়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’ নীতিতে চালু করা হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড। এর মাধ্যমে অসচ্ছল পরিবারের নারী প্রধানকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৭০ হাজার ৮৬১টি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে এবং ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ৪১ লাখ নারীকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
কৃষকদের সার, উন্নত বীজ, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতির সহায়তা সরাসরি পৌঁছে দিতে চালু হয়েছে কৃষক কার্ড। প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ২০ হাজার ৮৩২ কৃষককে কার্ড দেওয়ার পাশাপাশি ৫ কোটি ১২ লাখ টাকা প্রণোদনা বিতরণ করা হয়েছে।
প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা, বিমা ও বিভিন্ন সরকারি সেবায় অগ্রাধিকার দিতে চালু হয়েছে প্রবাসী কার্ড। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের জন্য ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ধর্মীয় নেতাদের ভাতা, ৭৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি, ক্রীড়াবিদদের বিশেষ ভাতা এবং ওএমএসের মাধ্যমে কম দামে খাদ্য সরবরাহসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ৪ কোটির বেশি পরিবারের জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষা-স্বাস্থ্যে সংস্কার, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে জাতি গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
নারী শিক্ষার প্রসারে স্নাতক ও অনার্স পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৭৫ লাখ শিক্ষার্থীর অভিভাবকের মোবাইল অ্যাকাউন্টে ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকার বেশি উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের জন্য ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সুবিধা এবং নতুন আবাসিক মডেল স্কুল ও টেকনিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন আটকে থাকা বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ পরিশোধও শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ও ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড, উপজেলা হাসপাতাল ১৫১ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং প্রতিটি উপজেলায় ডায়ালাইসিস ইউনিট ও প্যাথলজি ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিশু হাসপাতাল, ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম কমানোর উদ্যোগও রয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় উদ্যোগ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ২৪ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যা নিরাপদ মজুতের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ১৯ দশমিক ৬১ লাখ টন চাল, ২ দশমিক ৯৬ লাখ টন গম ও ১ দশমিক ৬৯ লাখ টন ধান।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে ১ হাজার ১১টি কেন্দ্রে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল এবং ভর্তুকি মূল্যে আটা বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি টিসিবির মাধ্যমে প্রতি মাসে ৬৭ লাখের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। খাদ্যের মান নিশ্চিত ও ভেজাল রোধে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন এবং ফসল-পরবর্তী অপচয় কমাতে আধুনিক সাইলো ও মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামো খাতে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনে ৬২ জেলায় প্রায় ২ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার নদী-খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। পাশাপাশি রেলপথ আধুনিকায়ন, সমন্বিত ইলেকট্রনিক টোল ব্যবস্থা, বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, এভিয়েশন হাব এবং গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নেও বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার উদ্যোগ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জুনের চীন সফরে ডিজিটাল অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাইসহ ২১টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশি কর্মীদের সুরক্ষা, নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং অনিয়মিত কর্মীদের বৈধকরণে দুই দেশ একমত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফোরামেও বাংলাদেশের অবস্থান জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ ও পর্যটন সহজ করতে খসড়া ভিসা নীতি ২০২৬ প্রণয়ন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশের মর্যাদা ও কূটনৈতিক সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হচ্ছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রথম ১৮০ দিনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, প্রশাসনে স্বচ্ছতা এবং বিচারব্যবস্থায় গতি আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসনে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত ১ হাজার ১০২ জন উত্তরাধিকারীকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় সংস্কার, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৬ এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে নিয়মিতই জবাবদিহি করবে। নির্বাচনের আগে ঘোষিত আমাদের দলের পরিকল্পনা এবং নির্বাচনি ইশতেহার জনগণের জানা। ইশতেহারের কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে, সেটিও ধারাবাহিকভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষোভের বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজকে সরকারক জরুরি ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন ভবন নির্মাণের আগে জঞ্জাল পরিষ্কার করতে হয়। একইভাবে অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গকে প্রথমেই এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হচ্ছে, যাতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া যায়। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের সময়কালে সব কর্মসূচি একযোগে বাস্তবায়নের চেয়ে রাষ্ট্রকে নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উপযোগী করে তোলার কাজই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। সরকারের মেয়াদ যত এগিয়ে যাবে, প্রাথমিক পুনর্গঠনের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের পরিকল্পনা আরও মসৃণ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গুম, খুন, অরাজকতা ও মেগা দুর্নীতির ‘ভগ্নস্তূপের’ ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ করছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রথম দিন থেকেই সক্রিয় রয়েছেন। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি এবং পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ অভিযানের মাধ্যমে সরকার সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো প্রতিকূল পরিস্থিতি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতিকে কিছুটা মন্থর করলেও সরকার দমে যায়নি। সরকার তা অতিক্রম করে জনগণের স্বস্তি ও কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন করার জন্য নির্বাচনি ইশতেহারে যে কথা বলা আছে, সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। প্রশাসনকে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে সেখান থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। খুব শিগগির জনপ্রশাসন সংস্কারের আনুষ্ঠানিকভাবে একটা কমিশন করতে যাচ্ছি; সেটা আপনারা দেখতে পাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীর সঞ্চালনায় মতবিনিময় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক এসএম আব্দুল আউয়াল, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ছিলেন- প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিশেষ সহকারী রাশেদ খান, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল, প্রধানমন্ত্রীর স্ক্রিপ্ট রাইটার মাহফুজুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, মো. সুজাউদ্দৌলা, শাহাদাৎ স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার ও আশরোফা ইমদাদ।
কেকে/ এমএস