শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● যুদ্ধ নয়, শান্তি ও মানবতার বিশ্ব চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী      ● সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ● রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সাবেক ওসি রাকিবুল পাঁচ দিনের রিমান্ডে       ● ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে কিছু হবে না’ বলা সেই ওসি গ্রেপ্তার      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আটজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৭৮২      ● হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      ● ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      
খোলাকাগজ স্পেশাল
প্রভাবশালীদের দাপটে অনিরাপদ সড়ক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। ঝরছে প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন সাধারণ পথচারী। আবার দুর্ঘটনার পর মামলা হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতায় অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে বিচার। এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দেয় হতাশা। অন্যদিকে এসব ঘটনায় সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত থাকলে অর্থের বিনিময়ে করা হচ্ছে আপস-মীমাংসা। 

বিশেষ করে রাজধানীর গুলশান, বারিধারা, বনানী ও উত্তরা এলাকায় বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই সামনে আসে। সংশ্লিষ্টদের মতে— এসব এলাকায় বিত্তশালীরা বিভিন্ন আয়োজন ও পার্টি শেষে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। যা সাধারণ পথচারীদের প্রাণহানির অন্যতম কারণ। 

অতিসম্প্রতি রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম গাড়িচাপায় নিহত হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা। এর মধ্যেই নিহতের পরিবারের সঙ্গে আসামিপক্ষের ৯ লাখ টাকায় আপসের তথ্য জানা গেছে। এ-সংক্রান্ত আপসনামায় বাদীপক্ষের স্বাক্ষর রয়েছে। সেখানে আসামি জামিনে মুক্তি পেলে কিংবা খালাস পেলে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হবার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান। তিনি লেখেন, ‘গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যার ৪৮ ঘণ্টাও এখনো পার হয়নি; ইতোমধ্যেই ৯ লাখ টাকা দিয়ে বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বিশ্রামরত ২৪ বছর বয়সি নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে হত্যার ঘটনাটি মিটমাট করে ফেলার আয়োজন করা হয়েছে। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যার পর যদি এভাবে টাকার বিনিময়ে দায়মুক্তি মেলে, তাহলে দেশে আইন-আদালতের কোনো প্রয়োজন আছে কি?’

তিনি লিখেন— ‘নিহত নাগরিকের পক্ষে রাষ্ট্র বাদী হয়ে মামলা করা প্রয়োজন; তাহলে এসব বখাটে-উচ্ছৃঙ্খল স্বভাবের ধনীর দুলালদের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় মেহেদীর মতো নির্মাণশ্রমিকরা এভাবেই পথেঘাটে গাড়ির চাপায় পিষ্ট হয়ে মরবে, আর ধনীর দুলালেরা একটা বিজনেস ক্লাস টিকিটের পয়সা দিয়ে মানুষ হত্যার দায় থেকে মুক্তি পাবে।’

এ প্রসঙ্গে কথা হলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ খোলা কাগজকে বলেন, বিচার বিভাগের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব রয়েছে। তারা ভুক্তভোগীদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে, সেটিও দেখার বিষয়। একই সঙ্গে সড়কের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখাতে হবে। 

তিনি বলেন, এসব ঘটনার পর মানুষ কেন আদালতে যাচ্ছে না বা আসামিরা কেন পার পেয়ে যাচ্ছে; এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। গ্রামগঞ্জে অনেক অপরাধের ক্ষেত্রে এখনো শালিশ ও অর্থের বিনিময়ে মীমাংসার প্রবণতা রয়েছে। বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা এবং মামলার বড় ধরনের জটও এর অন্যতম কারণ। এ ছাড়া ভুক্তভোগীরা অনেক সময় সঠিকভাবে সুরক্ষা পান না। বরং আসামিরাই তুলনামূলক বেশি সুরক্ষা পায়। ফলে বিচার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে অনেকে আপস-মীমাংসা করে থাকেন। 

তিনি আরও বলেন, কোনো অপরাধে ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় ভাবেন, মামলা করে তাদের কী লাভ হবে। কারণ দীর্ঘদিন মামলা চালানোর পরও আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। এর সঙ্গে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় লড়াই করার বিষয়টিও রয়েছে। বছরের পর বছর মামলা চললে আসামিপক্ষ ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের হুমকি দিতে পারে। এতে অনেকেই মামলা চালিয়ে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ বিষয়ে আইন রয়েছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ দুর্বল। বিত্তশালী বা প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকলে অনেক সময় এ প্রয়োগ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। সেজন্য বিদ্যমান আইনগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।

এদিকে গাড়িচাপায় মেহেদী হাসান মীম নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় ভিন্ন ব্যক্তিকে আসামি করার অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। ঘটনাটি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও তারা অবগত নন বলে জানিয়েছেন। যা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। 

স্বজনেরা জানান, মেহেদী হাসান মীম নিহতের ঘটনায় রাজধানীর গুলশান থানায় মামলা করেন নিহতের ভাই মোক্তাদির ইসলাম। মামলায় মূল অভিযুক্ত কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। গাড়িচালক হিসেবে অন্য এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তা ছাড়া গণমাধ্যমে প্রচার হওয়া মামলার আপস-মীমাংসার বিষয়েও স্বজনেরা কেউ জানেন না।

স্বজনের দাবি, মামলার বাদী মোক্তাদির ইসলাম নিহত মীমের সৎভাই। তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আলাদা বাড়িতে থাকেন। বাবা ও সৎমায়ের সংসারে কোনো সহযোগিতা করতেন না তিনি। বাক্প্রতিবন্ধী হয়েও পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরেছিলেন নিহত মীম।

মীমের ভগ্নিপতি মুফতি মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম জানান, গণমাধ্যমে দেখানো ফুটেজের মাধ্যমে তারা বুঝতে পারেন, নিরীহ এক চালককে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। মুজিবুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার কাজে মীমের দাফন শেষে মামলার বাদী মোক্তাদির ও আমার শ্বশুর এরশাদুল হক ঢাকায় গেছেন।’

নিহত মীমের চাচা রাকিবুল ইসলাম রকি জানান, মামলার বাদী মোক্তাদির নিহত মীমের সৎভাই। তিনি মীম বা তার বাবা-মাকে ভরণপোষণ দিতেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি ছিলেন মীম।

মীমের চাচাতো ভাই আল-আমিন জানান, অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতেন মীম। বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় ইশারায় কথা বলতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নির্মাণশ্রমিকের কাজ করে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। অবসরে কাগজের ফুল তৈরি করে গ্রামীণ মেলা ও বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করতেন।

আল-আমিন বলেন, ‘মীম নিহত হওয়ার ঘটনাটি টাকার বিনিময়ে আপস-মীমাংসা করলে চলবে না। প্রকৃত দোষীর শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮’র বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদিরের আদালতে আসামিদের হাজির করা হয়। এ সময় আসামি পক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন আপসের বিষয়টি আদালতকে জানান।

আইনজীবী আলমগীর হোসেন বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে। ইতোমধ্যে ওই টাকা নিহতের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হয়েছে। আপসনামায় সই করে তারা আসামির জামিন বা খালাসের বিষয়ে কোনো আপত্তি না থাকার কথা জানিয়েছেন।

আইনজীবী আলমগীর হোসেন আরও বলেন, যে ছেলেটা, উনি ছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী। উনি কানেও শুনতেন না এবং কথাও বলতে পারতেন না। আর যে অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে, অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পরে ওরাও কোনো আপত্তি করেনি, তাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমাদেরও কোনো অভিযোগ নেই। আমরা উভয়ে মিলেমিশে, ওদের মা-বাবা বুড়ো, তাদের দেখাশোনার ভারের জন্য মধ্যস্থতার মাধ্যমে ৯ লাখ টাকা ওদের হিসাব করে দিয়ে দিয়েছি। আপসনামায় সই করে দিয়ে গেছে। এই মামলায় আসামি যদি জামিন পায়, খালাস পায়, তাহলে কোনো আপত্তি নেই।

এই আপসনামাটা কে করেছে? এই অ্যাক্সিডেন্টটা তো ড্রাইভারের, উনি তো আন্ডারএজ, প্রশ্ন করা হলে আইনজীবী বলেন, আন্ডারএজ গাড়ি চালিয়েছে? না, না, সে গাড়ি চালায়নি। গাড়ি যখন উল্টে গেছে, তখন সে ওইদিক দিয়ে বের হয়েছে।

ভুক্তভোগীর পরিবারকে কোনো ভয় দেখানো হয়েছে কিনা, তাদের কত টাকা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন বলেন, কোনো ভয়ভীতি, চাপ, কিছুই তাদের দেখানো হয়নি। এ নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। টাকা দিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, হ্যাঁ, দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়ে গেছে। এবং তারা পোস্টমর্টেমও করাতে রাজি হয়নি। তারা মামলাও করতে চায়নি।

মামলা কীভাবে হলো, প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, যেহেতু অ্যাক্সিডেন্ট ওই দিনের, পুলিশ মামলাটা করেছে।
একটি জীবনের মূল্য ৯ লাখ টাকা হতে পারে? এমন প্রশ্নের উত্তরে আইনজীবী বলেন, ‘নিহত পথচারী প্রতিবন্ধী ছিলেন। বাদীরা মনে করেছেন আপস করবেন। তারা এ আপসে খুশি। উনারা ১০ লাখ টাকা দাবি করছিলেন। আমরা বলে ৯ লাখ টাকা ঠিক করেছি। আমাদের যেহেতু এজাহারে নাম নেই, আন্ডারএজ, আমরা জামিন চাই।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রভাবশালী   অনিরাপদ সড়ক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close