অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত খোঁজখবর নিয়ে মুচলেকায় ৪৫১ কিশোরকে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম, নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা ও ওয়ারেন্টের কারণে ১৭৩ জনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে, গত বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে রাতভর জেলার ১৮টি থানার পুলিশ একযোগে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে তাদের আটক করা হয়।
অপরাধের কেন্দ্র লাল পাহাড় :
কুমিল্লার লালমাই পাহাড় দিনদিন অপরাধের স্বর্গ হয়ে উঠছে। এখানে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্ষণের ঘটছে অহরহ। সর্বশেষ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদার সন্তান অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর উঠে আসে লালমাই পাহাড়ের অপরাধের নানা তথ্য।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে লালমাই পাহাড়ে হাতিগাড়া থেকে মেহেদী হাসান নামের এক কিশোর অটোরিকশা চালকের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
গেল বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি পাহাড়ের চণ্ডীমুড়া থেকে শিশু রিফাত হোসেনের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২৯ আগস্ট কোটবাড়ির সাধুর মুড়া এলাকায় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পাহাড়ের নির্জন স্থানে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা সব বাড়িঘরে হরহামেশাই ঘটছে ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক কারবারের দ্বন্দ্বে সংঘর্ষ। রয়েছে পাহাড় ও বন বিভাগের গাছ কাটার সিন্ডিকেট। এসব ঘটনা অবিলম্বে থামানো না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা স্থানীয়দের।
নগরীতে এক যুগে ১২ খুন, সক্রিয় অন্তত ২০ দল কিশোর গ্যাং
কুমিল্লা নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়নি। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যার ঘটনায় তাদের নাম আসে। এর বাইরে শতাধিক অপরাধের ঘটনায় জড়ায় তারা। এলাকায় দখল ও পাল্টা শক্তি প্রদর্শনেও কিশোর গ্যাং সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়।
২০১৫ সালের দিকে বিষয়টি নগরে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন থেকে চারটি দল বেশি সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে গিয়ে সেই সংখ্যা হয় কমপক্ষে ২০টি। তবে শাখা দল ও উপদল মিলিয়ে গ্যাংয়ের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তখন সবচেয়ে আলোচিত ছিল রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, ইগল, আরজিএস, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ ও বস।
ওই সময় ধর্মসাগরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকার দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম ও লোগো লেখা থাকত। গ্যাং সদস্যদের মেসেঞ্জার গ্রুপ, একই ধরনের পোশাক-চুলের ছাঁট এবং নির্ধারিত আড্ডাস্থল ছিল।
পুরোনো দ্বন্দ্বের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ রতন ও ইগল। ২০২২ সালে ধর্মসাগর পাড় ও নগর উদ্যান এলাকা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে ১৫ বছরের রবিউল হাসান শাহাদাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সার্কিট হাউস মোড় এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন আহত হয়। ককটেল বিস্ফোরণের ওই ঘটনায় ১৬ জনকে গ্রেপ্তার এবং চারটি মামলা করা হয়। এছাড়াও নগরীর বাইরে জেলার আরো ১৬টি উপজেলায় অন্তত কয়েক ডজন কিশোর গ্যাং রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানা গেছে।
থানার দরজা ভেঙে ‘ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে বের হয় ২২ জন:
অভিযান শুরুর পর গত বুধবার রাত ১০টার দিয়ে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে থানার দরজা ভেঙে বেরিয়ে যায় ২২ কিশোর। এদিকে থানার সামনে ওইসব কিশোর ও তাদের অভিভাবকদের একটি হট্টগোলের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। অভিভাবকরা জানান, আটক কিশোরদের মধ্যে বেশিরভাগের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধসংক্রান্ত রেকর্ড খাতায় কোনো অভিযোগ নেই। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বিকেল থেকে আটক কিশোরদের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন দাউদকান্দি মডেল থানার প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে সেখানে হট্টগোল ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘তেমন কিছু হয়নি। অপ্রয়োজনে ঘুরাফেরার কারণে সন্দেহভাজন হিসেবে ২৮জনকে আটক করা হয়। তাদের স্বজনরা এক সাথে আসলে একটু ভিড় হয়। রাত সাড়ে ১০দিকে ২২ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকি ৬ জনকে যাছাই বাছাই চলছে।’
মধ্যরাতে আড্ডা দেওয়ার সময় কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় আটক ছেলেকে নিতে থানায় আসেন অভিভাবক সুচিত্রা সরকার। তিনি বলেন, ‘ছেলে কথা শোনে না, আড্ডা দেয়। পুলিশ খারাপ মনে করেছে বলেই নিয়ে এসেছে। তা না হলে কেন নিয়ে আসবে? আমি চাই, আমার ছেলে ভালো হয়ে যাক।’
আরেক অভিভাবক ফজলে রাব্বি বলেন, ‘আমার ছেলে অপরাধ করলে শাস্তি পাক। এতে আমার কোনো অভিযোগ থাকবে না। তবে কোনো নিরপরাধ সন্তান যেন পুলিশের ঝামেলায় না জড়ায়, সেটাও নিশ্চিত করা দরকার।’
যা বলছেন কুমিল্লার সচেতন মহল
সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, ‘এমন কোনো অপরাধ নেই যেটা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা করছে না। এদের আবার রাজনৈতিক নেতারা লালন-পালন করেন। এ কারণে অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া ছেলেরা ভবিষ্যতে আরও বড় সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। তাদের বিষয়ে কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, পরিবারকেও সেই খবর রাখতে হবে তা না হলে কিশোর অপরাধ কমবে না।’
মানবাধিকার কর্মী ফারহা এমদা ইম্পার দাবি কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাংকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তার পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানের চলাফেরা, বন্ধুত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, ‘কুমিল্লায় বর্তমানে এমন কোনো পাড়ামহল্লা নেই, যেখানে কিশোর গ্যাং নেই। বিগত সময়ে যুবলীগ ছাত্রলীগের নেতাদের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। বিএনপির কেউ কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, এমন তথ্য জানা নেই।’
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। গত ১৫ দিনে অভিযান চালিয়ে পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
কেকে/ এমএস