রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। সিএনজিচালিত পরিবহন চালকরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। ফিলিং স্টেশনের লাইনেই তাদের সময় কাটছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস মিলছে না। আবার যৎসামান্য যা মিলছে তা দিয়ে একটি সিএনজি দুই ট্রিপও দিতে পারছে না।
স্বল্পচাপের কারণে অনেক সিএনজি স্টেশনই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু পরিবহন নয়, বাসাবাড়িতেও ভোগান্তি চরমে উঠেছে। চুলা জ্বলছে না। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাস ও বৈদ্যুতিক চুলায় চলছে রান্না। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। চাকরি হারানোর ভয়ে আছেন বহু শ্রমিক। সবমিলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থামকে গেছে।
দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের জন্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাট ও ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশার দৌরাত্ম্যকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, “ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার কারণে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। মধ্যরাতে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার সময় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়।”
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপও একই ধরনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “স্বৈরাচারী সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনার কারণেই আজ গ্যাস সংকট হচ্ছে।”
এদিকে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করেও এ খাত থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয়।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং দূর করতে সরকার শিল্পকারখানায় গ্যাস কম দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রেগুলোয় সরবরাহ করছে। এরপরও লোডশেডিং দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। তীব্র গরম ও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন নাগরিকরা।
গ্যাসশূন্য রাজধানীর ফিলিং স্টেশন
গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি কোথাও কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বা হচ্ছে। গ্যাস পেতে রাতে লাইনে দাঁড়িয়ে পরের দিন গেলেও গ্যাস মিলছে না। বেশির ভাগ পাম্পে গ্যাস নেই বলে বন্ধ রাখা হয়েছে।
উত্তরার বিমানবন্দর সংলগ্ন মেসার্স মাসুদ এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পের সামনে থেকে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেড় কিলোমিটার লম্বা হয়েছে। চালকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, গ্যাসের জন্য তারা ভোর ৪টা থেকেই লাইনে অপেক্ষা করছেন।
এক চালক জানান, গ্যাস নিতে ভোর ৫টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। প্রায় ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর বেলা ১১টায় ১৭০ টাকার গ্যাস পান তিনি।
ইমরান নামের একজন প্রাইভেট কারচালক জানান, দক্ষিণখান থেকে গ্যাস নিতে এসে উত্তরার দুটি পাম্প ঘুরে ভোর ৬টায় লাইনে দাঁড়ান তিনি। গ্যাসের কোনো চাপ নেই। তারপরও আমরা অপেক্ষা করছি।
বদলে যাচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা
রাজধানীর মালিবাগের আলেয়া বেগম বিভিন্ন মেসে রান্নার কাজ করেন। সকালে রান্নার কাজ শেষ করেন দুপুরের আগেই। রাতের রান্না করেন বিকেল বা সন্ধ্যায়। কিন্তু বাসাবাড়িতে গ্যাসের তীব্র সংকট তার সেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে।
এখন সকালের রান্নার কাজ শেষ করতে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আর সন্ধ্যার রান্নার কাজ করতে হচ্ছে রাত ৯টা থেকে ১০টার দিকে। রাত করে কাজ করতে স্বামীও দিতে চান না। ইতোমধ্যে গ্যাসের অভাবে একটি বাড়ির রান্নার কাজও হারিয়েছেন তিনি।
সাজেদার মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের রান্নাঘরেও এখন একই চিত্র। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ থাকে না। কোথাও সকাল থেকে গ্যাস মিলছে না, কোথাও আবার গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস আসছে।
ফলে রান্নার সময় বদলে গেছে অনেক পরিবারের। কেউ গভীর রাতে রান্না করছেন, কেউ হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। আবার নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে লাকড়ির চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
শিল্পোৎপাদনে ধস
গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্প ও কলকারখানাগুলোয় উৎপাদন কমে গেছে। কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং, ডাইং ও ওয়াশিং খাতের কারখানা কর্তৃপক্ষের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা ১৫ দিন ধরে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে।
বন্ধ শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী কারখানা
গ্যাসের চাপ না থাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে দেশের অসংখ্য শিল্প কারখানা। এর মধ্যে গত তিন দিন বন্ধ রয়েছে দেশের শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী কারখানাগুলো। আগামী কয়েকদিনে কোম্পানিগুলোর কাছে থাকা চিনির মজুত শেষ হলে দেশজুড়ে সরবরাহ চেইনে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বাজারে কমেছে চিনির সরবরাহ। পাশাপাশি বাড়তে শুরু করেছে দাম।
দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত তিন দিনে প্রতি মণ চিনির দাম বেড়েছে ৭০-৭৫ টাকা। শনি-রোববার থেকে এ দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি সরবরাহ কমে গেলে চিনির অন্যতম ব্যবহারকারী হিসেবে খাদ্যপণ্য প্রস্তুতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংকটের পেছনে দুই টার্মিনাল
মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা দিনে ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে টার্মিনালটির স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হয়।
পরে অক্ষত বয়লার থেকে ৬ আগস্ট সীমিত পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়। তবে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে কারিগরি সমস্যার কারণে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। মেরামতের পর রাতে আবার সরবরাহ শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে চলতি সপ্তাহের শুরুতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনালে নতুন এলএনজি কার্গো যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে টার্মিনালে মজুত থাকা এলএনজি দিয়ে কয়েক দিন সরবরাহ চালাতে হয়।
মজুত কমে আসায় সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ কমানো শুরু হয়। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) তা ২০ কোটি এবং বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ১০ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সামিটের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
পরে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে সামিট আবার গ্যাস দেওয়া শুরু করে। ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়িয়ে শনিবার সকালে তা প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছে।
সামিট-এক্সিলারেট চালু, সরবরাহ বৃদ্ধির আশা
দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। মহেশখালীর সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল দুটিই একসঙ্গে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে। গতকাল শনিবার (১৫ আগস্ট) সকালে মোট সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উঠেছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, সকালে সামিটের টার্মিনাল থেকে ৪৬০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এক্সিলারেট থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই টার্মিনাল থেকে এলএনজিভিত্তিক সরবরাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন ঘনফুট।
স্বৈরাচারী সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনার কারণেই গ্যাস সংকট : চিফ হুইপ
জনগণের সরকার সবার সহযোগিতায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দূর করতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, বিগত সরকারের সময় দেশের ৯৮ শতাংশ গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ একটি বিশেষ দেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। স্বৈরাচারী সরকারের এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও জ্বালানি অব্যবস্থাপনার কারণেই বর্তমানে দেশে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ ভাগ কারখানা থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আগে শুধু গ্যাস স্বল্পতার বিষয়টি নিয়ে মালিকরা ফোন করতেন। গত কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের প্রকট সমস্যার কথা জানাচ্ছে বিভিন্ন কারখানা কর্তৃক্ষ।
কেকে/সাশ