রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬,
১ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: জবাবদিহিতা থাকলে সরকারের পদক্ষেপ জনকল্যাণমুখী হবে      দুপুরের মধ্যে যেসব জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস      টুইট করে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে না, যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান ইরানের      প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফর : নিরাপত্তায় পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ      পাঁচ দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা, হতে পারে ভারী বর্ষণ      বড় ধাক্কা খেল ভারত      বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রিজভীসহ চার নেতা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ছয় মাসে সাফল্যের চেয়ে সংকটই বড়
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৮ এএম আপডেট: ১৬.০৮.২০২৬ ১০:২১ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। নির্বাচনি ইশতেহারে পরিবর্তন, সুশাসন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কিছুটা প্রতিফলন সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে দেখা গেলেও এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে আছে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান সুফল।

রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক পরিবর্তন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের কিছু পদক্ষেপ সরকারের অর্জনের তালিকায় থাকলেও মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

এর সঙ্গে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। সরকারের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় দুর্বলতাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার বিতর্কিত বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে। একই সময়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখনো বহাল থাকায় নীতির দ্রুত বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রথম ছয় মাসের হিসাব বলছে, সরকার একদিকে অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষায় বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে পুরোনো সংকটের পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপও সামলাতে হচ্ছে। ফলে সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিকে কাগজের কর্মসূচি থেকে মানুষের ঘরের বাস্তব সুবিধায় পরিণত করা।

উদ্যোগ থাকলেও সুফল সীমিত

সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে বেশ কিছু নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, সিঙ্গেল উইন্ডো এবং বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব উদ্যোগের ফল রাতারাতি পাওয়া সম্ভব নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুর্বলতা, ঋণপ্রবাহের নিম্নগতি এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট এখনো অর্থনীতির বড় দুর্বলতা।

অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সরকারের বাজেট ও নীতিগত উদ্যোগে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর ফল পেতে সময় লাগবে। তার মতে, নতুন বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা এখন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া টেকসই বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন।”

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ঋণ ও রিজার্ভের চাপ

নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো আগের সরকারের রেখে যাওয়া আর্থিক চাপ। দীর্ঘদিনের সরকারি ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, আর্থিক খাতে দুর্বলতা এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নিয়েই সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে।

রিজার্ভের পরিমাণ নিয়ে স্বস্তির কিছু তথ্য থাকলেও মোট রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিকভাবে হিসাব করা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সরকারের সামনে শুধু রিজার্ভ বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়, একই সঙ্গে বৈদেশিক দায় পরিশোধ, আমদানি ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে জমে থাকা আর্থিক দায়ের কারণে নতুন সরকারের নীতি বাস্তবায়নের পরিসর শুরু থেকেই কিছুটা সীমিত। তবে এখন দায়িত্ব সরকারের এই চাপ সামলে অর্থনীতিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী করা।

মূল্যস্ফীতির চাপ কাটেনি

অর্থনীতির কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরানোর ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। চাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে।

সরকার মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করলেও বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল করতে প্রত্যাশিত সাফল্য এখনো আসেনি। ফলে রিজার্ভ বা রেমিট্যান্সের ইতিবাচক হিসাবের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাজারের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, “সরকারের প্রথম ছয় মাসে আগের সরকারগুলোর তুলনায় মৌলিক পরিবর্তনের চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। জ্বালানি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বিনিয়োগ পরিবেশে জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থ গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে।”

বিনিয়োগ বাড়াতে চাঁদাবাজি বন্ধ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন আনু মুহাম্মদ। তার মতে, দলীয় বা পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, “চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থবান্ধব জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির অভাব আগের সরকারগুলোর সময়ও ছিল।”

বর্তমান সরকারের সময়ও এসব ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। জনগণের প্রত্যাশাকে সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড-কৃষক কার্ড প্রতিশ্রুতি

নির্বাচনি ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল নিম্নআয়ের পরিবার ও কৃষকদের সরাসরি সহায়তার আওতায় আনা। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সেচ, কৃষিঋণ, সার ও কৃষি প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের বকেয়া ঋণে স্বস্তি, খাল পুনঃখনন ও জলাশয়ে রেণুপোনা অবমুক্ত করার মতো কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এখানেই সরকারের সামনে বাস্তবায়নের বড় পরীক্ষা। প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন, তথ্য যাচাই, দেশব্যাপী বিস্তার এবং নিয়মিত সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রয়োজন। কর্মসূচির ঘোষণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে বাস্তব সুবিধা পৌঁছানোর মধ্যে এখনও ব্যবধান রয়েছে। ফলে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী মাসগুলোতে এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে করা যায় তার ওপর।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ধাক্কায় বাড়তি চাপ

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির নতুন চাপের মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। তেল সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও আমদানি খরচ নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দেশে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে। জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনে চাপ তৈরি করেছে।

ফলে সরকারের ছয় মাসের হিসাব করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংকট সামলানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সাময়িকভাবে সংকট বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটেই সবচেয়ে বেশি ভুগেছে শিল্প

সরকারের প্রথম ছয় মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে।

দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় সরবরাহ ব্যাহত হয়।

গ্যাসের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ে, শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং সার উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট শুধু জনভোগান্তির বিষয় নয়। এটি বিনিয়োগ, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

চাঁদাবাজি-দখল ঠেকানো সরকারের বড় পরীক্ষা

সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল ও ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, শিল্পাঞ্চল ও জলমহালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। 

লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে বিএনপির ২৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার ঘটনা আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ইটভাটা মালিকদের কাছ থেকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ দাবি করা হয়েছিল। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।

অন্যদিকে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট ও লালমাইয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ সরাসরি গ্রহণের জন্য বিএনপির এক সংসদ সদস্য অভিযোগ বাক্স স্থাপন করেন। দলীয় পরিচয়ে কেউ চাঁদাবাজি করলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর আহ্বানও জানানো হয়।
 
এ ছাড়া ময়মনসিংহের ভালুকার শিল্পাঞ্চলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় দলের এক সংসদ সদস্যকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। এসব ঘটনায় দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

নেত্রকোনার খালিয়াজুড়িতে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে বাজার ও জলমহাল নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দলীয় নেতৃত্বের কাছেও দেওয়া হয়েছিল। 

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অন্যতম ভিত্তি ছিল সুশাসন ও আইনের শাসন। তাই দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি বা দখল করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াই হবে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন নেই

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মাঠ প্রশাসনে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘মব সংস্কৃতি’ বন্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিলেও মাঠপর্যায়ে এসব পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছে।

টিআইবির জুন ২০২৬-এর ১০০ দিনের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে দুর্নীতি ও অনিয়ম মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট নীতিগত অবস্থান ও ঝুঁকি-ভিত্তিক কৌশলের অভাবের সমালোচনা করা হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধ, দখল, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে অপরাধের অভিযোগ যুক্ত হলে সেটি সরকারের ওপর সরাসরি রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

প্রশাসনে পতিত সরকারের প্রভাবও কাটেনি

সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলেও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আগের সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক বৈঠকে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে আগের সরকারের সহযোগী ও সমর্থকদের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় নতুন সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার ইতোমধ্যে বিতর্কিত নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে।

তবে প্রশাসনে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ রয়েছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ব্যাপকভাবে সরিয়ে দিলে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

এ কারণে যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে প্রশাসন পুনর্গঠনই সরকারের জন্য সবচেয়ে টেকসই পথ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অপপ্রচার ঠেকাতেও সরকারের দুর্বলতা 

সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়লেও দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ এবং ভুল তথ্যের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বিত যোগাযোগ কৌশলের ঘাটতিও চোখে পড়েছে। ফলে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগও কাক্সিক্ষতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের জন্য এখন একটি শক্তিশালী, দ্রুত ও সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। দ্রুত, নির্ভুল ও যাচাইযোগ্য তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে না পারলে প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে। কারণ তথ্যের শূন্যতা তৈরি হলে সেই জায়গা গুজব ও অপপ্রচার দখল করে নেয়।

কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিব্রত সরকার

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ও যাচাইবিহীন বক্তব্য না দেওয়ার নির্দেশ দিলেও পরবর্তী সময়ে কয়েকজনের মন্তব্য সমালোচনার জন্ম দেয়।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলমের পরিবহন খাতের চাঁদা নিয়ে বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে ইউনিয়নের নামকরণে পারিবারিক প্রভাবের অভিযোগ এবং একটি প্রকল্পের ফাইল অনুমোদন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মন্তব্যও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হয়।

শিক্ষামন্ত্রী এ এন এম এহসানুল হক মিলনের সময়ে এইচএসসি পরীক্ষা ও জলাবদ্ধতাজনিত দুর্ভোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ তৈরি হয়।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে পদত্যাগ মন্ত্রিসভার স্থায়িত্ব ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের বক্তব্য ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। জ্বালানি তেল ও পরে গ্যাস সরবরাহ সংকটে পড়ায় মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি ও সংকট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সীমান্ত হত্যা নিয়ে বক্তব্যও বিতর্ক তৈরি করে।

প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশলবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে পড়ার ঘটনাও সরকারের জন্য কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে।

সুশাসনের জায়গায় এখনও বড় ঘাটতি

সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নেও দুর্নীতি দমন, জবাবদিহি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতির ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু ঘোষণা নয়, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে তাই শুধু সাফল্য বা ব্যর্থতার একক কোনো মাপকাঠিতে বিচার করা কঠিন।

একদিকে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক পরিবর্তন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর উদ্যোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের সূচনা এবং ডিজিটাল সেবার বিস্তারের মতো অর্জন রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘাটতি, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অভিঘাত, চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনে পুরোনো প্রভাব এবং অপপ্রচার মোকাবিলায় দুর্বলতা সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষায়, নীতিগত উদ্যোগের পাশাপাশি দ্রুত সরকারি সেবা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করলেই বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে টেকসই গতি ফিরতে পারে।

আর অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বক্তব্যের সারকথা হলো, শুধু সরকার বদলালেই কাঙ্খিত পরিবর্তন আসে না; রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেও মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

এই জায়গাতেই তারেক রহমান সরকারের সামনে দ্বিতীয় ছয় মাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা যখন নিয়মিত নিম্নআয়ের পরিবারের ঘরে পৌঁছাবে, কৃষক কার্ড যখন মাঠের কৃষকের বাস্তব সহায়তায় পরিণত হবে, বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ মিলবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি-দখল বন্ধ হবে তখনই নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তব সাফল্যে রূপ নেবে।

এখন পর্যন্ত ছয় মাসের হিসাব তাই এমন উদ্যোগের কমতি নেই, কিন্তু সংকট কাটিয়ে সুফল ঘরে তোলার পথ এখনও দীর্ঘ।


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  বিএনপি   সরকার   সাফল্য-সংকট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close