গণটিকাদান কর্মসূচি চালুর প্রায় তিন মাস পরও দেশে থামছে না হামের ভয়াবহ আগ্রাসন। প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হচ্ছে হাজারেরও বেশি মানুষ, সেই সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে শিশু মৃত্যুর মিছিল।
পাঁচটি মাসও পুরো হয়নি। এরই মধ্যে ৯০০টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এ অদৃশ্য ও নীরব ঘাতক। টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই কিংবা সুরক্ষার সামান্য অভাবে অবুঝ শিশুদের এই করুণ মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি প্রতিটি অভিভাবকের বুকফাটা আর্তনাদ ও অসহায় কান্নার প্রতিচ্ছবি।
টিকা দিয়ে যে জীবনগুলো অনায়াসে বাঁচানো যেত, সেই শৈশবগুলো আজ ঝরে যাচ্ছে অকালে। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা এই শিশুদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ, আর প্রশ্ন উঠেছে এই থামানো যাওয়ার মতো মৃত্যুগুলো আর কত দীর্ঘ হবে?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য শৈথিল্য কিংবা সচেতনতার অভাবেই এই নীরব ঘাতক শিশু মৃত্যুর মিছিলে রূপ নিচ্ছে, যা রোধে জরুরি ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে গত পাঁচ মাসে হাম ও এর উপসর্গে দেশে মোট ৯০২ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হাম শনাক্ত হয়ে মারা গেছে ৯৯ শিশু এবং হামের উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে ৮০৩ শিশু।
পরিস্থিতির তীব্রতা বজায় রয়েছে এখনও; সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গত শুক্রবার (১৫ আগস্ট) সকাল আটটা থেকে গতকাল শনিবার (১৬ আগস্ট) সকাল আটটা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ৮টি শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
অবুঝ শিশুদের এই ধারাবাহিক প্রাণহানি অভিভাবক ও চিকিৎসকদের চরম উৎকণ্ঠায় ফেলেছে।
গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৭২৮ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গেল ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য প্রকাশ করে আসছে।
গেল ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে ছয় জনই ঢাকা বিভাগের। বাকি দুই জন সিলেটে বিভাগের। শুধু ঢাকা জেলায় মারা গেছে পাঁচ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩৫২ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে।
এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৩২ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ৯১, চট্টগ্রামে ৬৩, বরিশালে ৪৭, ময়মনসিংহে ৭২, খুলনায় ৩২ ও রংপুর বিভাগে ১৪ জন মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গেল ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে গেছে ৭২৮ জন। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৭০০ জন। ঢাকা বিভাগে ২৭৭ জন, রাজশাহীতে ২০, সিলেটে ৬৩, চট্টগ্রামে ২১৯, বরিশালে ৫৪, ময়মনসিংহে ৩০, খুলনায় ২৫ ও রংপুরে ১২ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
এ নিয়ে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম রোগী ভর্তির সংখ্যা দাঁড়াল ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৯৪। তাদের মধ্যে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৯ জন হাসপাতাল ছেড়েছে। আর দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৬। আর নিশ্চিত হাম রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৮০০ জনে।
থামছে না শিশুর মৃত্যু মিছিল, আতঙ্কের নাম হাম
প্রতিরোধযোগ্য এক রোগের ভয়াল থাবায় দেশের প্রতিটি কোণ থেকে আসছে কেবল শিশুদের কান্নার রোল। গণটিকাদান কর্মসূচির দীর্ঘ তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কিছুতেই থামছে না হামের এই মৃত্যুমিছিল; বরং প্রতিদিন হাজারো শিশুর আক্রান্ত হওয়া আর ঝরে যাওয়া তাজা প্রাণ পুরো জাতিকে গভীর উদ্বেগে ফেলে দিয়েছে।
গত দুই দশকেও যা দেখা যায়নি, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা ও টিকাদানের পরও এভাবে অবুঝ শৈশবের অকালমৃত্যু কেবল একটি স্বাস্থ্যসংকটই নয়, বরং গোটা সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো এক বড়ো মানবিক বিপর্যয়।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, টিকাদানের পর এভাবে হাম ছড়িয়ে পড়া এবং মৃত্যু বেড়ে যাওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে ঠিক সেটাই ঘটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চারটি বড় ভুলের কারণে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়েছে। এগুলো হলো ২০২৪ সালে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না করা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়মিত টিকাদানে গাফিলতি, চলতি বছরে ব্যাপক সংক্রমণের পরও হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা না করে গতানুগতিক পদ্ধতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সর্বশেষ গণটিকা কর্মসূচিতে প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যাওয়া।
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। নিয়মিত টিকাদান ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ কর্মসূচির কারণে হামসহ বিভিন্ন রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানের ঘাটতিকেই বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, “২০২০ সালের হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পর ২০২৪ সালে আবার এ ধরনের কর্মসূচি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। এটি ছিল বড় ভুল। এরপর ২০২৫ সালে বছরজুড়ে টিকাদানে গাফিলতি দেখা গেছে। চলতি বছর গণটিকাদান শুরু হলে দেখা গেল, প্রায় ৪০ লাখ শিশু এর বাইরে রয়ে গেছে। এটিও বড় ধরনের ভুল।”
তিনি আরও বলেন, “এর ফলে এখন পাঁচ বছরের বেশি বয়সী এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও হামের ঝুঁকিতে পড়েছে। এমনকি বেশি বয়সি মানুষের মধ্যেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।”
এ পরিস্থিতিতে মায়েদের থেকে শিশুরা কতটা হামের অ্যান্টিবডি পাচ্ছে, কোন বয়স থেকে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া দরকার, পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়া দরকার কি না, এসব নিয়ে একটি জাতীয় অবস্থানপত্র তৈরি হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বে-নজির আহমেদ আরও বলেন, “৯ মাস বা ৬ বছরের কম বয়সি, এমনকি নবজাতকেরও হাম হতে দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ মা থেকে অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে আসছে না। এর কারণ খুঁজতে গবেষণা জরুরি। আবার ক্যাম্পেইনের টিকার বয়সসীমা বাড়ানোরও দরকার হতে পারে। সেই সিদ্ধান্ত হতে হবে গবেষণার ওপর ভিত্তি করে। এসব সিদ্ধান্ত ও কৌশল দ্রুত না নিলে আমরা গভীর সংকটে পড়ে যেতে পারি।”
হামে মারা যাওয়া ৫১% শিশুর টিকার বয়স হয়নি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হামে মৃতদের ৫১ শতাংশের এই রোগের টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, হামের সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমছে। তবে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগে সংক্রমণ যে স্তরে ছিল, জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরও সেই পর্যায়ে আসেনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের সর্বশেষ সাপ্তাহিক রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে হামের পরিস্থিতি সম্পর্কে এ কথা বলেছে।
বিশ্লেষণে হাম ছাড়াও ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের পরিস্থিতি তুলে ধরেছে সংস্থাটি। এতে ৯ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা নেই।
এ বছর মার্চের শুরু থেকে দেশের কয়েকটি জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। দ্রুত দেশের ৬৪ জেলায় এ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন মৃত্যুর খবর দিচ্ছে; কিন্তু সংক্রমণ শুরু হওয়ার ছয় মাস পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ বা গণমাধ্যমকর্মীরা হামের বিশদ তথ্য বা পরিসংখ্যান পাননি। কোন বয়সি মানুষ হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, কোন বয়সি মানুষের বেশি মৃত্যু হচ্ছে, আক্রান্ত বা মৃতদের মধ্যে হামের টিকা নেওয়ার হার কেমন, টিকা নেওয়ার পরও হামের সংক্রমণ হয়েছে কি না, এসব বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এমনকি ৫ এপ্রিল জরুরি টিকাদান শুরু হওয়ার পর থেকে ২০ মে হামের জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর শিশুদের শরীর হাম প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জন করছে কি না, বা কতটুকু ক্ষমতা অর্জন করেছে তা জানার চেষ্টা করছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দেশের মানুষও জানতে পারছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামে মৃতদের ৯০ শতাংশ এ রোগের কোনো টিকা পায়নি। মৃতদের ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হামের এক ডোজ টিকা পেয়েছে; আর ২ দশমিক ১৯ শতাংশ হামের দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও মারা গেছে।
উল্লেখ্য, হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে।
হামে মারা যাওয়া মানুষের বয়সভিত্তিক বিভাজনও করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাতে দেখা যাচ্ছে, মৃতদের ২০ শতাংশের বয়স ৬ মাসের কম; আর ৬ থেকে ৯ মাস বয়স ৩১ শতাংশের। অর্থাৎ হামে মৃতদের ৫১ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। এদের কারও টিকা দেওয়ার বয়সই হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, হামে মূলত পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদেরই মৃত্যু হচ্ছে, এই হার ৯৪ শতাংশ।
হাম-রুবেলার টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইনের পর দেখা যায়, আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে। যা ক্যাম্পেইনের আগের আক্রান্তের হারের চেয়ে কম। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ৯ মাস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, আক্রান্তদের ২৮ শতাংশের এবং মৃতদের ৫১ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। হামের প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনা বা হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য শিশুদের টিকা নেওয়ার বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হয়।
অর্থাৎ যেসব যুক্তিতে নিয়মিত টিকাদানে সর্বনিম্ন বয়স ৯ মাস ধরা হয় এবং ক্যাম্পেইনের সময় বয়স কমিয়ে ৬ মাস করা হয়, তার কোনো কিছুই বাস্তবে কাজে আসেনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আক্রান্তদের ১০ শতাংশের এবং মৃতদের ২০ শতাংশের বয়স ৬ মাসের কম। যদিও এতকাল ধারণা করা হয়েছে, শিশুরা হামের অ্যান্টিবডি পায় মায়ের কাছ থেকে। তাই খুব কম বয়সি শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় না।
কেকে/সাশ