সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। এর চরিত্র ও লক্ষণেও এসেছে বড় ধরনের রূপান্তর। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার আচরণ। ধরন বা সেরোটাইপ পাল্টে যাওয়ায় ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা দ্রুত জটিল হচ্ছে, মৃত্যুহারও বাড়ছে। জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টি বা ক্রিটিক্যাল ফেজ এখন বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। আগে যেসব লক্ষণ দেখে ডেঙ্গু অনুমান করা হতো এখন সেগুলো আর মিলছে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে দেশে সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাব্যবস্থার প্রস্তুতির পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তারা। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে (বিএমইউ) অনুষ্ঠিত সেমিনারে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী বলেন, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও বাড়তে পারে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, রোগটির প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রোগ নির্ণয় না হলে রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড, একজনের মৃত্যু
চলতি বছরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে সর্বোচ্চসংখ্যক রোগী ভর্তি হওয়ার নতুন রেকর্ড হয়েছে। সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৭০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে একজনের। গতকাল এ তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ৮৪৮ জন। আর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জন নারী ও ২৮ জন পুরুষ। সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও ভাইরাসের ধরন পরিবর্তনের কারণে শুধু বর্ষা মৌসুমেই ডেঙ্গু হচ্ছে এমন নয়, সারা বছরই মিলছে রোগী। তবে এই সময়ে মাত্রাটা বেড়ে যায়। সেরোটাইপে পরিবর্তন আসায় রোগীদের মধ্যে জটিলতা দ্রুত তৈরি হচ্ছে।
তাদের মতে, এতদিন ডেঙ্গুর যে ধরনের প্রাধান্য ছিল একটি বিরাট সংখ্যা মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন ধরন এলে সেই অ্যান্টিবডি আগের রোগীদের যে সুরক্ষা দিয়েছিল, তা আর কাজে আসবে না। আগেরবারের ধরনে আক্রান্ত ব্যক্তি নতুন ধরনে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকবেন। আর নতুন ধরনে আক্রান্ত হলে তার জটিলতা বেড়ে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতা ও সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।
রোগতত্ত্ববিদরা জানান, ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। ডেঙ্গু ভাইরাসের রয়েছে চারটি সেরোটাইপ-ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪।
একবার এক সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হলে দেহে সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু আরেকটা সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডেঙ্গু জ্বর চারবার হতে পারে। যারা একবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করে বলছেন, ডেঙ্গুর উপসর্গের ধরন পাল্টে গেছে। রোগীভেদে রোগের লক্ষণের ভিন্নতা দেখা যায়। বর্তমানে ডেঙ্গুতে যেসব উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তা হলো, হঠাৎ জ্বর আসা আবার জ্বর না থাকা, কাশি, শরীর ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব, অসহ্য পেটে ব্যথা, চোখে ব্যথা, ব্লাড প্রেশার ও প্রস্রাব কম হওয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হাত-পা ফুলে যাওয়া, দেহে পানি আসা, পাতলা পায়খানাসহ প্লাটিলেটও অনেক কমে যাওয়া। জ্বরের তীব্রতা, তীব্র শরীর ব্যথা এবং র্যাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে না দেখে রোগীরা অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা নিতে বিলম্ব করছেন। ফলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোনো কোনো রোগী হেমোরেজিক ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো মারাত্মক জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। শেষ মূহূর্তে ডাক্তারদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসা দিতে।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হওয়া:
নতুন চরিত্রের ডেঙ্গুতে লিভার, কিডনি বা মস্তিষ্ক দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে। অতীতে কোনো একটি ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার অন্য ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত হলে ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’ বা শক সিনড্রোমের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত মারাত্মক। ডেঙ্গুর এ চরিত্রকেও নতুন বলা চলে। তবে ডেঙ্গু রোগীর প্রচুর বমি, পেটের ডানপাশের ওপরের দিকে বেশি ব্যথা, জন্ডিস ভাইরাসে লিভার আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেছেন চিকিৎসকেরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এতদিন দেশে ডেন-২-এর আধিপত্য থাকায় অনেক মানুষের শরীরে ওই ধরনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন ডেন-৩ বেশি ছড়ালে সেই অ্যান্টিবডি সুরক্ষা দিতে পারবে না। ফলে আগে ডেন-২-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন এবং তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ডেন-৩ সেরোটাইপের কারণে রোগীদের মধ্যে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে।
আইইডিসিআরের দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুর সেরোটাইপের আধিপত্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেনভ-১ ও ডেনভ-২ বেশি ছিল। ২০১৯ সালে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশের শরীরে ডেনভ-৩ শনাক্ত হয়েছিল। এরপর ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় আবার ডেনভ-২ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ৭০ শতাংশে ডেনভ-২ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে তা কমে ৪৮ শতাংশে নামে। কিন্তু চলতি বছরে ঢাকায় সংগৃহীত নমুনার ৯১ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে ডেনভ-৩ শনাক্ত হয়েছে, যা ভাইরাসের ধরনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইইডিসিআরের গবেষকরা বলছেন, অতীতেও সেরোটাইপের পরিবর্তনের পর ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বড় আকারে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবারও ডেনভ-৩-এর দ্রুত আধিপত্যকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডেঙ্গু নজরদারি আরও জোরদার করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দেওয়া এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
কেকে/ এমএস