মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় মসলা জাতীয় ফসল মৌরি চাষে লাভের স্বপ্ন বুনছেন সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাহারপুর গ্রমের চাষি জয় চন্দ্র দেব। মসলার জগতে ব্যাপক চাহিদা ও লাভজনক ঔষধিগুণ সম্পন্ন মৌরি চাষ এবার ভালো ফলনের সম্ভাবনায় জয়ের মুখে ফুটেছে হাসি। মৌরি চাষে উৎপাদন খরচ যেমন কম তেমনি লাভও বেশি।
সরজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার লাহারপুর গ্রামে খেত ভরে এখন মৌরি ফুলের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য আর ঘ্রাণ বাতাসে ভাসছে।
চাষি জয় চন্দ্র দেব বলেন, ‘মসলার জগতে মৌরির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এবার ২০ শতক জমিতে মৌরি চাষ করছি। উৎপাদন খরচ যেমন কম তেমনি লাভও বেশি। আশা করি ফলন ভালো হবে।’
মৌরি চাষে এ পর্যন্ত সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করেছেন তিনি। তবে, প্রায় ৩০ হাজার টাকা বিক্রির আশা করছেন জয়।
কিন্তু সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে বৃষ্টিপাত হওয়ায় কিছু ক্ষতিরও শঙ্কাও রয়েছে তার। কৃষি অফিস থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছেন বলেও তিনি
সুগন্ধযুক্ত উচ্চমূল্যের এই মৌরি দৈনন্দিন রান্নার কাজেও ব্যবহার হচ্ছে। পাঁচ ফোঁড়নের এক ফোঁড়ন মৌরি। এতে ঔষধি গুণও বিদ্যমান। সাথী ফসল হিসেবে মৌরি চাষ বেশ লাভজনক। চাহিদা থাকায় অধিক মুনাফার আশায় বিকল্প এই ফসল চাষে আকৃষ্ট হচ্ছে কৃষক। এই ফসল চাষে অতিরিক্ত মুনাফায় কৃষকের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। এ কারণে শ্রীমঙ্গলের কৃষকরা মৌরি চাষে ঝুঁকছেন।
বিভিন্ন এলাকায় ঔষধিগুন সম্পন্ন মৌরি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। কোথায় গুয়ামুরি বা কোথাও মহুরি। এর গাছ ২-৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুল দেখতে অনেকটা খোলা ছাতার মতো। সাধারণত ফুলের রঙ হলুদ আর সাদা হয়। পাতাগুলো চিরল, মসৃণ ও পাখির পালকের মতো।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার জমিতে মৌরির আবাদ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে ফসল মাঠে ভালো অবস্থায় রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রতি হেক্টরে গড়ে ১.১-১.৩ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যাবে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, মসলার উন্নতজাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ১০ শতক করে মোট ৮০ শতক জমিতে ৮টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। চাষিদের প্রণোদনা হিসেবে উন্নতমানের বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা হয়েছে। এর আগে দুই ব্যাচে ৬০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে মৌরি চাষে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।
জানা যায়, বীজ মসলা ফসলের মধ্যে জিরা, ধনে, মেথি ইত্যাদির মধ্যে অন্যতম মৌরি একটি গুরুত্বপূর্ণ মসলা ফসল। এটি রবি ও খরিপ উভয় মৌসুমেই সফলভাবে চাষ করা যায়, তবে খরিপ মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রবি মৌসুমকে এর চাষের জন্য সর্বোত্তম বিবেচনা করা হয়। কারণ এ মৌসুমে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম থাকে, বৃষ্টির কারণে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না এবং খরিপের তুলনায় উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়।৷
মৌরি পাচক ও প্রদাহ বিরোধী উভয় বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। এছাড়াও মৌরিতে ব্যথানাশক, প্রদাহরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাধাকপি, ফুলকপির সাথে সাথী ফসল হিসেবেও মৌরি চাষ করা যায়।
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, স্বল্প খরচে চাষ করা যায় এবং বাজারে চাহিদাও ভালো। সঠিক পরিচর্যা ও বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মৌরি হতে পারে শ্রীমঙ্গলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সংযোজন। চা শিল্পনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি মসলা জাতীয় ফসলের আবাদ বাড়লে কৃষকের আয় বাড়বে বহুগুণে।
সবকিছু অনুকূলে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মৌরি উৎপাদনে শ্রীমঙ্গল একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে বলে ধারণা কৃষি বিভাগ ও স্থানীয়দের।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুকুর রহমান বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে মৌরি চাষ হচ্ছে। আমাদের দেশে মৌরির ফল বা বীজ মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ব্যাপক চাহিদা সম্পন্ন মসলাজাতীয় এই ফসলের চাষ বাড়ানো গেলে বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণের দিকে আমরা এগোতে পারব।’
তিনি আরো বলেন, ‘সুগন্ধযুক্ত উচ্চমূল্যের মসলাদার ফসল মৌরি দৈনন্দিন রান্নায় অনেকখানি জুড়ে আছে। বহুগুণে গুণান্বিত এই মসলা। এতে প্রচুর পরিমাণে ঔষধিগুণও বিদ্যমান। বিভিন্ন ধরনের মাছ-মাংসের তরকারি, আচার, পিঠা, নানাধরনের মিষ্টি খাবারে মৌরি ব্যবহৃত হয়। পান মসলা হিসেবেও খুব জনপ্রিয়।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘অনুকূল পরিবেশ, মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ুর কারণে স্বল্প খরচে ভালো ফলন পাওয়ার আশায় শ্রীমঙ্গলে মৌরি চাষ বাড়ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার জমিতে মৌরির আবাদ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে ফসল মাঠে ভালো অবস্থায় রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রতি হেক্টরে গড়ে ১.১-১.৩ মেট্টিক টন ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের বীজসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
কেকে/এমএ