চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে কর্ণফুলী চ্যানেল ও বন্দর সীমানায় ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনায় যুগোপযোগী পরিবর্তন এসেছে। চবকের সংশ্লিষ্ট সকলের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সরাসরি হাইড্রোগ্রাফী বিভাগের তত্ত্বাবধানে কর্ণফুলী নদীর মোহনা হতে বন্দর সীমানার অন্তর্গত প্রধান জেটি এবং কালুরঘাট পর্যন্ত নেভিগেশনাল চ্যানেলে ও বন্দর সীমার অন্যান্য চ্যানেলে নাব্যতা রক্ষায় এখন এক সাশ্রয়ী ও কার্যকর মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।
চবকের পরিকল্পিত ও বাস্তবধর্মী কার্যকর উদ্যোগের ফলে ড্রেজিং খাতের ব্যয় অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, যা সংস্থার আর্থিক সাশ্রয়ে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
চবকের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যের (হারবার ও মেরিন) তত্ত্বাবধানে হাইড্রোগ্রাফী বিভাগের মাধ্যমে পরিচালিত এই ড্রেজিং কার্যক্রমে বর্তমানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে দক্ষ ঠিকাদার নিয়োগ নিশ্চিত করে ড্রেজিংয়ের কাজগুলোকে ছোট ছোট পরিকল্পিত অংশে ভাগ করে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়ায় ঠিকাদাররা অনেক বেশি দায়বদ্ধতার সাথে কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। বাস্তবসম্মত ব্যয় নির্ধারণ ও আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থার ফলে ড্রেজিং খাতের অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রবণতা কমানো সম্ভব হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে গত এক বছরে চবকের নিজস্ব ড্রেজারের মাধ্যমে ড্রেজিং ও পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং কার্য সম্পাদনের ফলে সংস্থাটির ড্রেজিং খাতে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
চবকের সচিবালয় বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর প্রশাসনিক তদারকি এই সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। চবকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নিয়মিত তদারকির ফলে ড্রেজিংয়ের প্রকৃত পরিমাণ ও মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এই কৌশলী উদ্যোগের ফলে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চ্যানেলগুলোতে প্রয়োজনীয় নাব্যতা সার্বক্ষণিক বজায় থাকছে, যার ফলে বড় আকৃতির বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখন অনেক বেশি নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে বন্দরে যাতায়াত করতে পারছে। এর ফলে বন্দরের পণ্য খালাস ও হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ-রুটে চট্টগ্রাম বন্দরের বিশ্বস্ততা আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
এছাড়া কর্ণফুলী নদীর উপর সীমানায় বিশেষ করে সদরঘাট হতে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর উজানে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় নেভিগেশনাল চ্যানেল ও সংযুক্ত খালগুলোতে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ড্রেজিং কাজ সম্পাদনের ফলে ওই এলাকায় লাইটার জাহাজসহ অন্য নৌযানগুলো সমন্বিতভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ উপায়ে বার্থিং করা হচ্ছে বিধায় নৌ দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। একইসাথে ওই এলাকায় শহরের সাথে সংযুক্ত আটটি গুরুত্বপূর্ণ খালের মুখে চবক সীমানায় ড্রেজিংপূর্বক নাব্যতা রক্ষা করার ফলে খাল দিয়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে আমা পানি নির্বিঘ্নে কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে।
এর ফলে, এটা আগামী বর্ষায় চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেকাংশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এমন পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের ফলে কর্ণফুলী নদীর নেভিগেশনাল চ্যানেল ও অন্যান্য অংশে দীর্ঘ মেয়াদী টেকসই হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল অবস্থার তেমন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে না, যার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখাসহ নদীতে পলি জমার হার অনেকাংশে কমে আসছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরসহ অন্যান্য ব্যক্তি মালিকানাধীন জেটি বা বার্থ এর সুফল পাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ওই খালগুলোর সম্মুখভাগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) কর্তৃক ড্রেজিং করা হলে কর্পোরেশনের খাল ড্রেজিং খাতে অতিরিক্ত কমপক্ষে ৮৫ কোটি টাকা খরচ হত, যা চবক কর্তৃক ড্রেজিং করার কারণে সাশ্রয় হয়েছে। ড্রেজিং খাতে সাশ্রয় হওয়া এই বিপুল অর্থ এখন বন্দরের অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে।
চবকের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, যথাযথ তদারকির ফলে ঠিকাদার-নির্ভর ড্রেজিং কার্যক্রমে এই ধরনের আর্থিক শৃঙ্খলা ও ব্যয়-সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি শুধু বন্দরের অভ্যন্তরীণ ভিত্তিকেই শক্তিশালী করেনি, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্বচ্ছতা ও টেকসই উন্নয়নের এই ধারা বজায় রেখে চবক দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের এই প্রধান প্রবেশদ্বারকে বিশ্বমানের আধুনিক বন্দরে রূপান্তর করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
কেকে/এমএ