কিশোরগঞ্জের নিকলীতে শতবর্ষী একটি ঐতিহ্যবাহী বেতি আড়া খাল ভরাটের অভিযোগ উঠেছে ইমরান হোসেন নামের এক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েকশ একর ফসলি জমির সেচ কাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে অন্তত শতাধিক পরিবার।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের পশ্চিম পুড্ডা এলাকায় বেতি আড়া খালটি দীর্ঘ সময় ধরে পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খালের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে, যার ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালটি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের পাঁয়তারা চলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এলাকার পরিবেশ ও কৃষির ওপর বিপর্যয় ডেকে আনবে।
অভিযুক্ত ইমরান হোসেন নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের রোদার পুড্ডা এলাকার মৃত হিস্মত আলীর ছেলে।
স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই খালের পানির ওপর নির্ভর করে তারা বছরের বিভিন্ন সময় ফসল আবাদ করেন। এখন খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। অন্যদিকে, বর্ষার সময়ে বৃষ্টির পানি নামার কোনো পথ না থাকায় বসতবাড়ি ও ফসলি জমিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকদের মতে, খালটি এই অঞ্চলের কৃষির প্রধান উৎস। এটি বন্ধ হয়ে গেলে অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ কৃষক পরিবার সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে এবং তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। এলাকাবাসী প্রশাসনের কাছে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে অবৈধ ভরাট বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আবুল বলেন, “এই খালটি আমাদের এলাকার কৃষির প্রাণ। এটি বন্ধ হয়ে গেলে এলাকার দুই-তিনশ কৃষক পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। প্রতিবাদ করতে গেলে আমাদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। কখনও কখনও বহিরাগত সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এসে জোরপূর্বক খালটি ভরাট করা হয়। জনস্বার্থে অবিলম্বে খালটি উদ্ধার করে পুনঃখনন করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার জন্য প্রশাসনের কাছে আমি জোর দাবি জানাচ্ছি।”
দোলেনা বেগম বলেন, “বাপ-দাদার আমলের এই খালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা আজ চরম বিপদে আছি। পানি সরতে পারছে না, চলাচলের পথও বন্ধ। প্রভাব খাটিয়ে খালটি ভরাট করা হচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের জীবন-জীবিকা আজ হুমকির মুখে। আমাদের শুধু বাপ-দাদার খালটি আগের মতো ফিরে পেতে চাই।”
আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম বলেন, “এই খালটি প্রায় ২০০ বছরের পুরনো, যা বাপ-দাদার আমল থেকে নৌ-চলাচল ও পানির প্রধান উৎস ছিল। কিন্তু গত ঈদের পর প্রভাবশালীরা সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে জোরপূর্বক এটি ভরাট করেছে। আমরা সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করলে প্রাণের ভয়ে মুখ খুলতে পারছি না। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, এই অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খালটি পুনঃখনন করে আমাদের যাতায়াত ও কৃষির সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।”
জারইতলা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, “একসময় এই খাল দিয়ে কটিয়াদী পর্যন্ত নৌ-যোগাযোগ ছিল। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত খালটি দখলমুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি। প্রয়োজন হলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পর্যন্ত জানানো হবে। কারণ তিনি খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছেন, আর আমাদের এলাকায় খাল দখল করে ভরাট করা হয়েছে। এটি কিছুতেই মানা যায় না।”
অভিযুক্ত ইমরান হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি খোলা কাগজকে বলেন, “রেকর্ডে কোনো খাল নেই। কাগজে-কলমে কিছু নেই। এখানে খাল বলতে নকশার ভিতরেও কিছু নেই। যদি জনগণের সুবিধা অনুযায়ী রাস্তা দিয়ে দিতে পারি, তাহলে আমার দাবি নেই।”
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, “এ বিষয়ে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খাল ভরাটের কোনো সুযোগ নেই, সরকার খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে।”
কেকে/এলএ