সৌদি সরকারের ঘোষিত হজ ব্যবস্থাপনার রোডম্যাপ অনুযায়ী—১৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে চলতি বছরের হজ ফ্লাইট। এ উপলক্ষে ১৭ এপ্রিল রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হজ ফ্লাইট কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ায় এখন হজযাত্রীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে রাজধানীর আশকোনা হজ ক্যাম্প। যাত্রীদের সেবা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিবিড় তদারকিতে ব্যস্ত রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে হজ ফ্লাইট শুরুর আগের দিন থেকে ক্যাম্পে সরাসরি হাজিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। তাঁর সরাসরি তদারকি হজযাত্রীদের যাত্রা আরও স্বস্তিদায়ক করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় কমেছে হজের ব্যয়ও। হজযাত্রীদের জন্য বিমানের টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে হজযাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় কমানোরও আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
হজযাত্রীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ওটি ও ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টদের সমন্বয়ে বিশেষ চিকিৎসক দল গঠন করা হয়েছে। শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে হজযাত্রীদের ভিসা ও বিমান টিকিট। সব মিলিয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও সংশ্লিষ্টদের তৎপরতায় এবার হজযাত্রা স্বস্তিদায়ক ও সুশৃঙ্খল বলে জানিয়েছেন হজযাত্রীরা।
সমন্বিত হজ চিকিৎসক দল গঠন: হজযাত্রীদের চিকিৎসা ও সার্বিক সেবা নিশ্চিত করতে প্রথম পর্যায়ে ৯৭ সদস্যের একটি ‘সমন্বিত হজ চিকিৎসক টিম’ গঠন করা হয়েছে। এতে রয়েছেন ৪৫ জন চিকিৎসক, ২৪ জন নার্স, ১৬ জন ফার্মাসিস্ট এবং ১২ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবু শাহেদ মোহাম্মদকে টিম লিডার এবং ইউরোলজি বিভাগের ডা. মফিজুর রহমানকে ডেপুটি টিম লিডার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২৪ সদস্যের হজ প্রশাসনিক দল এবং ৩৫ সদস্যের প্রশাসনিক সহায়ক দল গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনিক দলের সদস্যদের মধ্যে ১৩ জন মক্কায়, ৭ জন মদিনায় এবং ৪ জন জেদ্দায় দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশাসনিক সহায়ক দলের ১৭ জন মক্কায়, ১২ জন মদিনায় এবং ৬ জন জেদ্দায় দায়িত্ব পালন করবেন। এর পাশাপাশি ৯ সদস্যের হজ কারিগরি টিম গঠন ও তাঁদের সৌদি আরব প্রেরণের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
টিকিটপ্রতি খরচ কমেছে ১২ হাজার টাকা: এবার হজযাত্রীদের জন্য বিমানের টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত। সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এবার কোনো চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা ছাড়াই ৭৮ হাজারের বেশি হজযাত্রীকে পরিবহন করা হচ্ছে। আর হজযাত্রায় টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা খরচ কমানো হয়েছে।
অন্যদিকে আগামী বছর থেকে হজযাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি হজের খরচ আরও কমানোর আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত শুক্রবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বছরের হজ ফ্লাইট কার্যক্রমের উদ্বোধন করার সময় এই আশ্বাস দেন তিনি।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার গঠনের আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই এই হজ ব্যবস্থার বেশিরভাগ কাজগুলো হয়ে গিয়েছিল। তারপরও যতটুকু সম্ভব আমরা চেষ্টা করেছি, অন্তত ১২ হাজার টাকা কমানোর চেষ্টা করেছি। আগামী বছর যাতে আরও খরচ কমাতে পারি, কম খরচে যাতে হজে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারি—আপনারা দোয়া করবেন।’
অনিয়ম সহ্য করা হবে না, জানিয়ে মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি: ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ বলেছেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের হজ ব্যবস্থাপনা অনেক সুন্দর হয়েছে। হজযাত্রীদের যাত্রা আরও নির্বিঘ্ন করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ এবং এ নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা গাফিলতি সহ্য করা হবে না। গত শুক্রবার রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রথম হজ ফ্লাইট উদ্বোধনের আগে আশকোনা হজ ক্যাম্পে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ধর্মমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে হজ ক্যাম্প ও বিমানে গিয়ে হজযাত্রীদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং হজ ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়ম যেন না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। মন্ত্রী বলেন, বিমান ও হজ ক্যাম্পের প্রতিটি বিভাগ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে দায়িত্ব পালন করছে। প্রধানমন্ত্রী বিমানে ও ক্যাম্পে যাত্রীদের খোঁজ নিয়েছেন বলেও জানান মন্ত্রী।
এবারের হজের বিশেষ সুবিধার কথা উল্লেখ করে কায়কোবাদ বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর হজের টিকিটের দাম জনপ্রতি ১২ হাজার টাকা কমানো হয়েছে, যা হজযাত্রীদের জন্য বড় একটি স্বস্তি।
এ বছর যাচ্ছেন সাড়ে ৭৮ হাজার বাংলাদেশি: পবিত্র হজ পালনে বাংলাদেশ থেকে এ বছর প্রায় ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরব যাবেন। তাঁদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৬৫ জন সরকারি ব্যবস্থাপনায় আর ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হজ পালন করবেন। বাংলাদেশ থেকে এ বছরের প্রথম হজ ফ্লাইটটি গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে যাত্রা করে। ৪১৮ জন হজযাত্রী নিয়ে ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের জেদ্দার বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
এর আগে রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে তিনি সরাসরি প্রথম ফ্লাইটের উড়োজাহাজে যান। প্রধানমন্ত্রী হজযাত্রীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পরে তিনি হজযাত্রীদের সাফল্য কামনা করে মোনাজাতে অংশ নেন। মোনাজাত শেষে তিনি হজযাত্রীদের কাছে দেশের জনগণ ও সরকারের জন্য দোয়া চান। রাত ১২টার কিছুক্ষণ আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে হজ ফ্লাইটের উদ্বোধন করেন।
এ সময় ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ও প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জাফের এইচ. বিন আবিয়াহ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী আশকোনা হজ ক্যাম্পে যান। সেখানে তিনি হজযাত্রীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বর্ধিত ফ্লাইট শিডিউল ও উড়োজাহাজ ভাড়া কমানোসহ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরই হজ ফ্লাইট শুরু হচ্ছে। এ বছর মোট হজযাত্রীর প্রায় অর্ধেক বহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বাকি হজযাত্রীদের বহন করবে সৌদিয়া ও ফ্লাইনাস এয়ারলাইনস। প্রথম দিনে মোট ১৪টি ফ্লাইট পরিচালনার কথা রয়েছে। আগামী ২১ মে হজ-পূর্ব ফ্লাইট শেষ হবে। এ বছর মোট ২০৭টি হজ-পূর্ব ফ্লাইট নির্ধারিত রয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১০২টি, সৌদিয়া ৭৫টি এবং ফ্লাইনাস ৩০টি ফ্লাইট পরিচালনা করবে।
চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে আগামী ২৬ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ৩০ মে ফিরতি ফ্লাইট শুরু হবে। ফিরতি ফ্লাইট চলবে ১ জুলাই পর্যন্ত।
কেকে/এলএ