সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন হাওরে পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। ভালো ফলনের কারণে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। তবে এই আনন্দের মাঝেও দেখা দিয়েছে নতুন দুশ্চিন্তা। শ্রমিক সংকট ও অকটেনের অভাবে অনেক হারভেস্টার মেশিন সচল রাখা যাচ্ছে না। আবার যেগুলো সচল আছে, জমিতে পানি জমে থাকায় ধান কাটতে পারছে না হারভেস্টার মেশিন। ফলে সময়মতো ধান কেটে ঘরে তোলা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকরা।
কৃষকরা জানান, এ বছর অনুকূল আবহাওয়া ও আগাম জাতের চাষাবাদের কারণে ধানের ফলন ভালো হয়েছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা ও শ্রমিক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাম্পার ফলনের সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ২৩টি ছোট-বড় হাওরে মোট ১৭ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এতে প্রায় ৭০ হাজার ৬৫০ টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩২০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কর্মসূচির আওতায় ৮০টির মতো কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা চলছে।
একাধিক কৃষক জানান, এ বছর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলেও বোরো ধান কাটার আগে বা পরে এ হাওরে কোনো শিলাবৃষ্টি হয়নি। জলাবদ্ধতার কারণে নিম্নাঞ্চলের কিছু ফসলের ক্ষতি হলেও সামগ্রিকভাবে এ বছর বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে হাওরের জাঙ্গালগুলো ভেঙে যাওয়ায় ফসল ঘরে তুলতে কৃষকদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে তারা সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, জাঙ্গালগুলো দ্রুত পাকা করে দেওয়ার জন্য। জাঙ্গালগুলো পাকা থাকলে ভবিষ্যতে ফসল পরিবহন অনেক সহজ হবে ও হাওরের ফসলি জমির পরিমাণও বাড়বে।
মাটিয়ান হাওরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের কৃষক জাকারিয়া হাসান বলেন, ‘ধানের ফলন ভালো হয়েছে। মাঠে পাকা, আধাপাকা ধান থাকা অবস্থায় যদি শিলা বৃষ্টি হলে তাতে ব্যাপক ক্ষতি হবে। শিলা বৃষ্টি না হলে আশা করছি, আনন্দের সঙ্গে সব ধান ঘরে তুলতে পারব। যদি হাওরে শ্রমিক সংকট না থাকে, কৃষকরা যদি ১৫-২০ দিন সময় হাতে পান, তাহলে হাওরের সম্পূর্ণ ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে।’
শনি হাওরের কৃষক আহামাদুল হাসান বলেন, ‘কৃষকেরা আমাকে জানিয়েছেন, চলতি বছর চৈত্র মাসের শুরু থেকেই হাওরে বৃষ্টি শুরু হয়। শুরুতে হালকা হলেও পরবর্তী টানা ভারী বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে অনেক হাওরের ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে, কোথাও কোথাও পুরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। হাওরের নিচু জমিগুলোতে এখনো বৃষ্টির পানি জমে আছে। তবে জমিতে পানি জমে থাকায় এবার কম্বাইন্ড হারভেস্টার বা রিপার মেশিন দিয়ে ধান কাটতে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।’
শনি হাওরের কৃষক ইন্নছ আলী বলেন, ‘জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে শ্রমিক সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে ধান কেটে ঘরে তুলতে কৃষকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’
তিনি জানান, ডিজেল সংকটের কারণেও অনেক হারভেস্টার হাওরে কাজ করতে পারছে না। হারভেস্টার মেশিন ও পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া গেলে ফসল কাটা ও মাড়াই কাজ অনেক সহজ হয়ে যেত।
এছাড়া শিলা বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি বা আকস্মিক বন্যা না হলে কৃষকরা স্বস্তির সঙ্গে ধান কাটতে পারতেন বলে ইন্নছ আলী উল্লেখ করেন।
‘কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকট ছাড়া নির্ধারিত সময়ে ধান ঘরে তুলতে পারলেই কৃষকদের মুখে হাসি ফুটবে।’
তাহিরপুর উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনির হোসেন বলেন, ‘তাহিরপুর উপজেলার শনি, মাটিয়ান, মহালিয়া, বর্ধিত গুরমা ও আঙ্গারুলি হাওরের প্রতিটি বাঁধে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সকল বাঁধের কাজ ইতোমধ্যে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এ বছর বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পিআইসিকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে তারা সার্বক্ষণিকভাবে বাঁধের আশপাশে অবস্থান করে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।’
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি মৌসুমে বোরো ধানের ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। চারদিকে ধান কাটার ধুম পড়েছে। সপ্তাহ আগ থেকেই ধান কেটে নিতে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে আগাম জাতের কিছু বোরো ধান কাটা শেষ হলেও বিল-হাওরে পুরোদমে ধান কাটা চলছে। বৈশাখের ২০-২৫ দিনের মধ্যে এখানের বোরো ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।’
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী অফিসার শাহরুখ আলম শান্তানু বলেন, ‘ধান কাটায় শ্রমিকসংকট মোকাবিলা ও কৃষকদের সুবিধার জন্য সাংসদের নির্দেশনায় যাদুকাটা নদীতে ১০ দিন বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই আদেশ কেউ অমান্য করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা প্রতিটি হাওরে পাকা বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। দ্রুত ধান কাটার জন্য কৃষকদের সব সময় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
কেকে/এমএ