মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
দেশজুড়ে
জ্বালানি সংকটে অচল হারভেস্টার, ভরসা হারাচ্ছে হাওরাঞ্চলের কৃষক
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:১৯ পিএম আপডেট: ২২.০৪.২০২৬ ৩:৫৮ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

ভরা মৌসুমে সোনালি ধানে মাঠ ভরে উঠলেও কৃষকের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ধান কাটা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। একসময় শ্রমিকের অভাবে ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন কৃষকরা, যার সমাধান হিসেবে দ্রুত ধান ঘরে তুলতে হাওরের কৃষকরা এখন অনেকটাই কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। তীব্র জ্বালানি সংকটে মাঠেই অচল হয়ে পড়ে আছে হারভেস্টার মেশিন। ফলে শ্রমিকের পর এবার আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর থেকেও ভরসা হারাতে শুরু করেছেন কৃষকরা।

হারভেস্টার ​মেশিন মালিকরা বলছেন, শুধু জ্বালানি সংকট নয়, খুচরা যন্ত্রাংশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সার্ভিসিং সেন্টারের অভাবও তাদের বিপাকে ফেলেছে। অনেক মালিক ব্যাংক ঋণ নিয়ে হারভেস্টার কিনেছেন, কিন্তু মেশিন বসিয়ে রাখায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

কৃষকদের ভাষ্য, তেলের দাম বাড়ায় ধান কাটার খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে গেছে, যা সাধারণ কৃষকের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় সময়মতো ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। জ্বালানি সংকটে যন্ত্র অচল হয়ে পড়ায় মাঠের ধান মাঠেই পাকার অপেক্ষায় রয়েছে, যা বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওর অঞ্চলে আবহাওয়া যেকোনো সময় প্রতিকূল রূপ নিতে পারে। সময়মতো ধান ঘরে তুলতে না পারলে আগাম বন্যা বা আকস্মিক বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ভয় সব সময় তাড়া করে বেড়ায় কৃষকদের। ধান কাটার এই ধীরগতির কারণে পুরো অঞ্চলের কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে এখন আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে গত কয়েক বছর ধরে কৃষকরা যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়েছেন। কিন্তু ভরা মৌসুমে তেলের এই সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি কৃষি কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যহত করছে। কৃষক পরিবারগুলোর দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং দাম নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। অন্যথায়, ভরা মৌসুমে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি।

সরেজমিনে হাওরে ঘুরে দেখা গেছে, সোনালী ধানে মাঠ ভরে উঠলেও কৃষকের মুখে হাসির বদলে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ। আনুষ্ঠানিকভাবে ধান কাটা শুরু হলেও যান্ত্রিক সংকটের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। ​সরকারি ভর্তুকি মূল্যে অনেক হারভেস্টার বিতরণ করা হলেও বর্তমানে সেগুলোর একটি বড় অংশই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। পর্যাপ্ত খুচরা যন্ত্রাংশ এবং দক্ষ মেকানিকের অভাবে সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলেই মেশিনগুলো দীর্ঘ সময় অচল থাকছে। ফলে মাঠের ধান কাটার জন্য কৃষকরা প্রয়োজনীয় যন্ত্র পাচ্ছেন না। ​

যে কয়েকটি হারভেস্টার সচল আছে, সেগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। অনেক জায়গায় জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা কারণে ধান কাটা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে। শ্রমিকের উচ্চ মজুরির কারণে কৃষকরা এখন যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু যন্ত্রের এই অনিশ্চয়তা তাঁদের অসহায় করে তুলেছে।​ কালবৈশাখী ঝড় কিংবা উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল যেকোনো সময় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। ধান পেকে গেলেও তা দ্রুত ঘরে তুলতে না পারায় কৃষকদের মনে বাঁধভাঙা পানির আতঙ্ক বাড়ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পুরো জেলাজুড়ে ৩৪০ টি  হারভেস্টার মাঠে ধান কাটার কাজে নিয়জিত। জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের তিনটি উপজেলাতেই চাষ হয়েছে ১ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে। জেলায় এবার বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন।

স্থানীয় এক কৃষক বলেন, ‘হাওরে এখন পুরোদমে ধান কাটার মৌসুম চলছে, অথচ আমরা এক চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। যে যন্ত্র দিয়ে ধান কাটব, সেই হারভেস্টার মেশিনে দেওয়ার মতো তেল বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজারে ঘুরেও ডিজেল যোগাড় করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। আবার যদিবা কোথাও তেলের সন্ধান মিলছে, সেই চড়া দামে তেল কেনার মতো নগদ টাকা আমাদের হাতে নেই। আমাদের সব পুঁজি তো এই মাঠেই ঢেলে দিয়েছি। এখন ফসল ঘরে তোলার এই শেষ মুহূর্তে এসে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। একদিকে তেলের আকাল, অন্যদিকে পকেটে শূন্যতা। আকাশের দিকে তাকালে ভয় লাগে—যদি অসময়ে বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নামে, তবে আমাদের সারা বছরের হাড়ভাঙা খাটুনি এক নিমেষেই তলিয়ে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে এই সোনালি ফসল আর ঘরে তোলা হবে না, আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’

হাওরের কৃষক মতি মিয়া বলেন, ‘আমরা কৃষকরা আজ এক চরম অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি। সার, কীটনাশক আর জমি চাষের পেছনে গত ছয় মাস ধরে আমরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছি। এখন ধান কাটার সময় দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বৃষ্টির কারণে ক্ষেতে হাঁটু সমান পানি। ​আমাদের কষ্টের সীমা নেই। ধান কাটার জন্য প্রতি কাঠা জমিতে মজুরি দিতে হচ্ছে ২,০০০ টাকা। অথচ সেই এক কাঠা জমির ধান বাজারে বিক্রি করতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ। অর্থাৎ, ধান বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরিটুকুও উঠছে না। বাকি খরচ তো দূরের কথা!’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কৃষকরা কি কেবল মরণ আর নির্যাতনের জন্যই এ দুনিয়ায় এসেছি? আমাদের কি কোনো মূল্য নেই? বাজারে আজ সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী, শুধু কৃষকের পণ্যের বেলায় গেলেই দাম কমে যায়। আমাদের অবস্থা এখন এমন যেন আমরা মানুষই না। ​অথচ এই বাংলাদেশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আমরা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ফসল ফলাই বলেই বড় বড় আমলা থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকে। আমরা উৎপাদন না করলে কেউ খেতে পারতো না। অথচ আজ আমাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি অবিচার করা হচ্ছে। এই যে সীমাহীন বঞ্চনা আর কষ্ট, এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো কোনো শব্দ আমাদের জানা নেই।’

হেলাল উদ্দিন নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘আমি একজন প্রান্তিক কৃষক। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আমি জমিতে ফসল ফলাই। কিন্তু বর্তমানে কৃষিকাজ করে টিকে থাকা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি তেল, সার এবং কীটনাশকের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদের খরচ এখন সাধ্যের বাইরে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকের বাড়তি মজুরি। বর্তমানে ১০ শতাংশ জমির ধান মেশিন দিয়ে কাটতে ২,০০০ টাকা খরচ হয়, যা প্রায় ৪ মণ ধানের মূল্যের সমান। দুর্ভাগ্যবশত, ১০ শতাংশ জমিতে গড়ে ৪ মণ ধানই ফলে। ফলে ফসল কাটার খরচ মেটাতেই সব ধান শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঝড়, বৃষ্টি ও তুফানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের সাজানো ফসল তছনছ করে দিচ্ছে, যা আমাদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ধানের যে বাজারদর রয়েছে, তা দিয়ে উৎপাদন খরচই উঠছে না। লাভ তো দূরের কথা, আমরা এখন লোকসানের বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরছি। এ অবস্থায় সংসার চালানো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আবেদন আমরা কৃষকরা দেশের মেরুদণ্ড। তাই সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ সার, তেল এবং কীটনাশকের দাম কমিয়ে কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ সহযোগিতা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হোক। ​আমরা যাতে সসম্মানে বেঁচে থাকতে পারি এবং দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারি, সেজন্য সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

হারভেস্টার চালক করিম মিয়া জানান, জ্বালানি সংকটের এই ভয়াবহ প্রভাবে অনেক অপারেটরই তাদের মেশিন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ কৃষকদের ওপর। মেশিনে ধান কাটতে না পারায় একদিকে যেমন ধান কাটার সময় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিক সংকটের কারণে অতিরিক্ত বা চড়া দামে ধান কাটতে হচ্ছে। আমরা চেয়েও কৃষকদের সাশ্রয়ী সেবা দিতে পারছি না। দ্রুত পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এই মৌসুমে কৃষকের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘জেলায় বর্তমানে ধান কাটার জন্য কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনের কোনো সংকট বা স্বল্পতা নেই। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মাঠের সমস্ত ধান একসঙ্গে পেকে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই কৃষকদের মধ্যে দ্রুত ধান কাটার একটি তাড়া থাকে। যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে একই সময়ে সবার ধান কাটা সম্ভব হয়ে ওঠে না, যার ফলে ধান কাটার ক্ষেত্রে কিছুটা সময়ের তারতম্য বা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হচ্ছে। এটি কোনো যান্ত্রিক সংকট নয়, বরং একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।​তবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিযন্ত্র পরিচালনার ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। সেই প্রেক্ষিতে হারভেস্টার মেশিনের ভাড়ার ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন আসাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং যুক্তিসঙ্গত। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং কৃষকদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।’

হাওর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি বাঁচাতে কৃষকরা জরুরি ভিত্তিতে সরকারি উদ্যোগে ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা, তেলের দাম কমানো এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায়, দেশের খাদ্যের বড় জোগানদাতা এই অঞ্চলের কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close