ক্রীড়াঙ্গনে জাতীয়তার সীমানা ভেঙে এক দেশের খেলোয়াড় অন্য দেশের জার্সি গায়ে জড়ানোর ঘটনা নতুন নয়। তবে বান্দরবানের প্রত্যন্ত সীমান্ত উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ির এক তরুণের ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দলে জায়গা করে নেওয়ার গল্প এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার চাকঢালা এলাকার সন্তান সাইফুল্লাহ শাকিব সম্প্রতি পোল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দলে সুযোগ পেয়েছেন। গত শনিবার (২৫ এপ্রিল) ক্রোয়েশিয়ার মাটিতে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিষেক ঘটে তার। এরপর স্বাগতিক ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও খেলেন তিনি। অভিষেক ম্যাচেই ৪ ওভারে মাত্র ১৭ রান দিয়ে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে নজর কাড়েন এই তরুণ পেসার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাইফুল্লাহ শাকিব নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউনুছের দ্বিতীয় সন্তান। ১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া শাকিবের শৈশব কেটেছে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে। পরিবারের ইচ্ছায় ২০০৬ সালে তাকে কক্সবাজারের একটি হেফজখানায় ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে নাইক্ষ্যংছড়ি মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও চাকঢালা মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষে দাখিল পাস করেন।
এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে জাতীয় দলের ক্রিকেটার এনামুল হক বিজয়-এর সহযোগিতায় মিরপুরের একটি কলেজে ভর্তি হন এবং ইংরেজিতে অনার্সে পড়াশোনা শুরু করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত ক্রিকেট অনুশীলন চালিয়ে যান। অবশেষে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সুযোগ পেয়ে পাড়ি জমান পোল্যান্ডে। সেখানে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন।
শাকিবের বাবা মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ‘আমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে শাকিব দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই সে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছিল। আজ সে পোল্যান্ড জাতীয় দলে খেলছে—এটা আমাদের জন্য গর্বের। আমরা সবাই তার জন্য দোয়া চাই।’
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে সাইফুল্লাহ শাকিব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘স্বপ্ন ছিল নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার। কিন্তু ভাগ্যে লেখা ছিল পোল্যান্ড। আলহামদুলিল্লাহ, সবকিছুর জন্য শুকরিয়া।’
পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও তার এ অর্জনে উচ্ছ্বসিত। তারা জানান, শাকিবের এই সফলতা শুধু তাদের পরিবারের নয়, পুরো এলাকার গর্ব।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘শাকিব খুবই ভদ্র ও অমায়িক ছেলে ছিল। তার এই সাফল্যের খবর এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা তার জন্য গর্বিত।’
এ বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘পোল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দলে সুযোগ পাওয়া সত্যিই বড় অর্জন। এটি আমাদের এলাকার জন্য সম্মানের। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।’
প্রত্যন্ত সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে ইউরোপের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা করে নেওয়া সাইফুল্লাহ শাকিব এখন অনেক তরুণের অনুপ্রেরণার নাম। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে, সুযোগ ও প্রচেষ্টা থাকলে সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চেও নিজের পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব।
কেকে/ এমএস