মানুষের জীবনে বিপর্যয় যখন আসে, তখন আপনজনরাই হয় শেষ আশ্রয়। কিন্তু নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার পূর্ব চিকনমাটি হুজুর পাড়া এলাকার ময়নুলের জীবনে ঘটেছে তার ঠিক উল্টো। যে আপন চাচার ছায়া হয়ে থাকার কথা ছিল, সেই চাচার চরম বিশ্বাসঘাতকতায় আজ এক সময়ের সচ্ছল ময়নুল যাযাবর, গৃহহীন এবং নিঃস্ব হয়ে পরেছে।
কয়েক বছর আগেও ময়নুলের জীবনটা ছিল এক টুকরো স্নিগ্ধ ছবির মতো। পূর্ব চিকনমাটি হুজুর পাড়ায় তার সাজানো আঙিনায় ছিল সুখের হাসি। নিজস্ব আবাদি জমি আর প্রিয়তমা স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে গড়ে তোলা সেই সংসারে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তার জীবনসঙ্গিনী তাকে ছেড়ে চলে যায়। সেই শোকের দাহ কাটতে না কাটতেই মাথার ওপর থেকে সরে গেল বটবৃক্ষের মতো ছায়া দেওয়া মা। টানা দু’টি আঘাত সইবার মতো শক্তি ময়নুলের ছিল না। শোকের পাহাড় মনের ওপর ভেঙে পড়ায় ময়নুল ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেললেন তার মানসিক ভারসাম্য। হাসিখুশি প্রাণবন্ত মানুষটি নিমিষেই সমাজের চোখে হয়ে পড়লেন ‘মানসিক প্রতিবন্ধী’।
ময়নুলের এই ঘোরতর অসহায়ত্ব যেখানে স্বজনদের মনে করুণা জাগানোর কথা ছিল, সেখানে তার আপন চাচা কছির উদ্দিন লুফে নিয়েছেন লালসা চরিতার্থ করার অস্ত্র হিসেবে।
অভিযোগ উঠেছে, ময়নুল যখন মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ, সেই সুযোগে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে তার বসতভিটাসহ সব জমিজমা নিজের নামে লিখে নেন কছির উদ্দিন।
কছির উদ্দিন ফায়ার সার্ভিসে বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত একজন সরকারি কর্মচারী। একজন সরকারি দায়িত্বশীল পদে থেকে নিজের আপন ভাইয়ের ছেলের ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার মতো এই জঘন্যতম অপরাধের সংবাদে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। শুধু জমি কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হননি কছির, ময়নুলকে তার পৈতৃক ভিটা থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে দখল করে নিয়েছেন সবকিছু।
সবকিছু হারিয়ে ময়নুলের এখন ঠিকানা হয়েছে স্থানীয় কবরস্থান। এলাকার কিছু সহৃদয় যুবক তার কষ্টের কথা চিন্তা করে সেখানে টিনের চালা ও চাটি দিয়ে একটি অস্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছিলেন। কিন্তু অমানবিকতার সীমা ছাড়িয়ে সেই ত্যানা-বিছানা এবং চাটিও রাতের আঁধারে লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে কছিরের ছেলে ও উপ সহকরী কৃষি কর্মকর্তা আ. ছালামের বিরুদ্ধে।
অসহায় ময়নুলের আপনজনরা যখন তাকে নিঃস্ব করে ছুঁড়ে ফেলেছে, তখন তার একমাত্র সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এলাকার সাধারণ মানুষ। বর্তমানে স্থানীয় দুই যুবক সুমন ও মশিয়ারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে পলিথিন কিনে ময়নুলের অস্থায়ী ঘরটি ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া এলাকার অনেক সাধারণ মানুষই যে যখন পারছেন, ময়নুলের দিকে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সমাজের এই সম্মিলিত মানবিকতাই ময়নুলকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।
ময়নুলের ওপর চলা এই জুলুমের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ডোমার উপজেলার সচেতন মহল। এলাকাবাসীর দাবি স্পষ্ট—তদন্ত সাপেক্ষে ময়নুলের পৈতৃক সমস্ত সম্পত্তি অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে। অভিযুক্ত কছির ও তার ছেলের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এলাকাবাসী জোরালো দাবি তুলেছেন যে, সরকারি কর্মচারী হয়ে একজন অসহায় প্রতিবন্ধীর সাথে এমন জঘন্য প্রতারণা করার দায়ে তাদের চাকরিচ্যুত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে।
পাশাপাশি জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কছিরের সম্পদ নিয়ে। ফায়ার সার্ভিসের একজন সাধারণ বাবুর্চি হয়ে কছির উদ্দিন কীভাবে বিশাল অট্টালিকা ও বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তার উৎস খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম ও ইউপি সদস্য জাহিনুর ইসলাম সুজন ময়নুলের জমি জবরদখলের বিষয়টি শুনেছেন বলে জানান।
ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী (ইউএনও) বলেন, ‘এখনো কেউ এ বিষয়ে অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/ এমএস