মৌলভীবাজার জেলার হাওরাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও টানা অতিবৃষ্টিতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাকা ধানের খেত চোখের সামনে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাওরপারের পরিবেশ।
অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের একাধিক প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি ও জমি বন্ধক নিয়ে চাষ করা কৃষকেরা।
কৃষকের অভিযোগ, শ্রমিক ও নৌকার সংকটের পাশাপাশি মজুরি ও ভাড়া বেশি হওয়ায় পানি থেকে কুড়িয়ে আনা ধানের মূল্যের সঙ্গে খরচের সামঞ্জস্য থাকছে না।
পচন ধরার অজুহাতে ক্রেতারা ধান কিনতে চাইছেন না, কিনলেও দিচ্ছে না ন্যায্যমূল্য। তাঁরা এ অবস্থায় ফসল নিয়ে টানাপোড়েনে আছেন, না পারছেন খেত ফেলে আসতে, না পারছেন তুলতে।
সদর উপজেলার বিরাইমাবাদ গ্রামের বর্গাচাষি জয়নাল মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “দিন-রাত বৃষ্টিতে জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। বুকসমান পানির নিচ থেকে ধান কেটে আনলেও লাভ হচ্ছে না।”
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল মালিক বলেন, “ফসল রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে কৃষকেরা আধপাকা ধান কেটে উঁচু জায়গায় রাখছেন, নৌকায় করে সরিয়ে নিচ্ছেন অথবা ভেজা ধান মাড়াই করছেন। তবে নৌকার সংকট ও শ্রমিকের অভাবে অনেক ধান পানিতেই পড়ে আছে।”
কৃষকেরা জানান, ৪০ থেকে ৫০ আঁটি ধান আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং শ্রমিক মজুরি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। ফলে ধান বিক্রি করে খরচই উঠছে না। পচা ও অঙ্কুরিত ধান ক্রেতারা নিতে চাচ্ছেন না — নিলেও দিচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য।
হাকালুকি হাওরপাড়ের কালনীগড় এলাকার কৃষক রাসেল মিয়া জানান, “আড়াই বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। পানির নিচ থেকে কিছু ধান তুললেও এক একরের বেশি জমি এখনো ডুবে আছে। শ্রমিক না পাওয়ায় বাকিটা ছেড়ে দিতে হয়েছে।”
রাজনগরের গোপাল নুনিয়া পাঁচ একর জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেছিলেন। পানির নিচ থেকে মাত্র চার শতক জমির ধান তুলতে পেরেছেন। ছয়জন শ্রমিক দিয়ে ধান তুলতে প্রায় আট হাজার টাকা খরচ হলেও ফলন পেয়েছেন মাত্র দুই-তিন মণ।
বর্গাচাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বাড়িতে রাখা ধানেও অঙ্কুর ধরেছে, রোদ না থাকায় শুকানো সম্ভব হচ্ছে না।”
একই চিত্র জলিল মিয়া, আবদুল কাদির, আলাল মিয়া ও শফিক মিয়ার ক্ষেতেও। অনেকেই নিজেদের ধান তুলতে না পেরে অন্যের ধান পরিবহনের কাজ করছেন। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রের মেঝেতে ধান শুকাতে দেখা গেছে কৃষক বাবুলাল দাসকে। তিনি বলেন, “ভালো ফলন হলেও আবহাওয়ার কারণে ঘরে তুলতে ।”
কৃষকেরা অভিযোগ করেন, তেল সংকট ও শ্রমিক ঘাটতির কারণে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করা যায়নি। আগাম সতর্কবার্তা থাকলে ক্ষতি কমানো যেত বলে তাদের দাবি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওর এলাকায়। ইতোমধ্যে সাত উপজেলার হাওরের দুই হাজার দুইশ হেক্টরের বেশি জমির ফসল নষ্ট হয়েছে এবং অন্তত ২০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত চলছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন। এদিকে কৃষকদের বাঁচাতে দ্রুত প্রণোদনার দাবিতে হাওর রক্ষা আন্দোলন প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে।
কেকে/এসএম