সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটু সমান কাদা, আর শুষ্ক মৌসুমে বড় বড় গর্ত—কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার বুরুদিয়া ইউনিয়নের কাগারচর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জন্য এটিই ছিল দীর্ঘদিনের ভাগ্যলিপি। বারবার প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। অবশেষে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ লাঘবে ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন কিশোরগঞ্জ জেলা যুব অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসান আহমেদ রমজান।
মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে হাসান আহমেদ রমজানের ব্যক্তিগত অর্থায়নে ও স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে কাগারচর এলাকার তালতলা বাজার সংলগ্ন আকন্দ বাড়ির প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁচা সড়কটি সংস্কারের কাজ শুরু হয়।
সড়কটি যাতায়াতের অযোগ্য হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ত শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জুতা হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কেন্দ্রে যেতে হতো। এছাড়া উত্তর পাশে মায়ের আঁচল আদর্শ বিদ্যালয়, দক্ষিণ পাশে ৫২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিরদী ফাজিল মাদ্রাসা ও একটি এতিমখানার কয়েক শত ছাত্র-ছাত্রীর যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই সড়কটি। কাদার কারণে প্রায়ই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুল কামাই করতে হতো।
অন্যদিকে, যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় এলাকার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারতেন না। কোনো জরুরি অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া ছিল একপ্রকার দুঃসাধ্য কাজ। হাসান আহমেদ রমজান নিজের অর্থায়নে ইটের সুরকি ও রাবিস কিনে আনলে এলাকার সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংস্কার কাজে অংশ নেন। তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে শরিফ আকন্দ, হযরত আলী ও আব্দুস সোবহানসহ স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গর্তগুলো ভরাট করে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করে তোলেন।
এলাকা প্রবীণ হযরত আলী বলেন, ‘‘আমাদের এই দুর্ভোগের কথা শোনার মতো আসলে কেউ ছিল না। বছরের পর বছর আমরা অবহেলিত ছিলাম। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাটি মরণফাঁদে পরিণত হতো; আমাদের বুড়ো হাড় নিয়ে কাদা মাড়িয়ে চলাচল করা যে কতটা কষ্টের, তা শুধু আমরাই জানি। আজ রাস্তাটি মেরামত হতে দেখে চোখে পানি চলে এল। অন্তত জীবনের এই শেষ সময়ে এসে একটু স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার সুযোগ পেলাম। এখন আর কাদা লেগে কাপড় নষ্ট হওয়ার ভয় নেই।’
স্কুলছাত্রী তানিয়া আক্তার জানায়, আগে আকাশ মেঘলা করলেই আমার মন খারাপ হয়ে যেত। বৃষ্টির দিনে রাস্তায় এত কাদা আর পানি জমে থাকত যে, স্কুলে যাওয়ার কথা ভাবলেই আতঙ্ক কাজ করত। অনেকবার কাদার মধ্যে পিছলে পড়ে গিয়ে বই-খাতা আর স্কুল ড্রেস নষ্ট হয়েছে, ফলে বাধ্য হয়ে স্কুল কামাই করতে হতো। এখন রাস্তাটি সুন্দর হওয়ায় সেই ভয় আর নেই। এখন আমি প্রতিদিন সময়মতো এবং নিরাপদে স্কুলে যেতে পারব, এটাই আমার বড় আনন্দ।
কৃষক আব্দুস সোবহান বলেন, ‘আমরা কৃষক মানুষ, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাই। কিন্তু রাস্তা খারাপ থাকায় সেই ফসল বাজারে নেওয়া ছিল এক বড় যুদ্ধ। ভ্যান বা রিকশা আসতে চাইত না, আর আসলেও দ্বিগুণ ভাড়া চাইত। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে গ্রামেই পাইকারদের কাছে ফসল বিক্রি করে দিতাম। এখন রাস্তা ভালো হওয়ায় আমি নিজেই সময়মতো ফসল সরাসরি বড় বাজারে নিয়ে যেতে পারব। আশা করছি, এবার ফসলের সঠিক দাম পাব এবং আমাদের অভাব কিছুটা দূর হবে।’
হাসান আহমেদ রমজান বলেন, ‘বিগত সময়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নিচু রাস্তাগুলো সংস্কার ও প্রশস্ত করে পাকাকরণ করা হলেও বুরুদিয়া ইউনিয়নের অনেক রাস্তা এখনো অবহেলিত। উন্নয়নের ছোঁয়া না লাগায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এই এলাকার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে প্রতি বছর নিজ এলাকা ও আশেপাশের রাস্তাঘাট ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেরামত করার চেষ্টা করি। এই জনসেবা যেন আমি সারাজীবন বিলিয়ে দিতে পারি, সেজন্য আপনাদের সকলের কাছে দোয়া চাই।’
ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও স্থানীয় শক্তির সমন্বয়ে অবহেলিত সড়ক সংস্কারের এই ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা থাকলে জনপ্রতিনিধিদের আশায় বসে না থেকেও সমাজ পরিবর্তন সম্ভব। হাসান আহমেদ রমজানের এই কাজ এখন পুরো পাকুন্দিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
কেকে/এমএ