সম্প্রতি কাগজ শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট প্রদান বন্ধ আছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করলেও কাঙ্ক্ষিত সনদ পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা। এতে উচ্চশিক্ষা, চাকরি, স্কলারশিপ আবেদন, ভিসা প্রসেসিং সহ জরুরি কাজে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে পড়াশোনা শেষ করে সনদপত্র উত্তোলন করতে ভয়াবহ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের অনার্স ও মাস্টার্স শেষে বিভাগের ফলাফল প্রকাশের কপি, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, নম্বরপত্র ও সনদপত্র প্রদানের কাজ করে থাকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর। সাধারণভাবে আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে এবং জরুরি আবেদনের ৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সনদপত্র প্রদানের নিয়ম রয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা। নির্দিষ্ট ফি দিয়ে আবেদন জমা দিলেও ট্রান্সক্রিপ্ট প্রিন্টের কাগজ শেষ হয়ে যাওয়ায় এটি প্রদান বন্ধ রেখেছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর। আর বারংবার তাগাদা দিলেও কাগজ কিনে দিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে স্থবির হয়ে গেছে ট্রান্সক্রিপ্ট প্রদান, চাকরির আবেদন সহ বিভিন্ন কাজে হেনস্তা হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে ট্রান্সক্রিপ্ট প্রিন্টের কাগজ শেষ হওয়ার উপক্রম হলে হাতে সময় রেখেই কাগজ কেনার জন্য চাহিদা পত্র দেয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর। তবে সরাসরি সেই কাগজ কেনার বাজেট অনুমোদন না দিয়ে কাগজ কেনায় অনিয়ম হতে পারে- এমন আশংকায় উপাচার্যের কাছে ট্রান্সক্রিপ্ট প্রিন্টের জন্য ক্রয়কৃত কাগজের মান ও দাম যাচাই-বাছাইয়ে একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম।
পরবর্তীতে উপাচার্য ড. নকীব নসরুল্লাহ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. আলীনূর রহমানকে আহ্বায়ক ও ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. পিকুল কে সদস্য সচিব করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। তবে রোজা ও ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার সময়মতো মিটিং ই করেনি উক্ত কমিটি।
এদিকে, কাগজ সংকটের কারণে একাধিক বার তাগাদা দিলেও কোন কাজ হয়নি।
কিন্তু কাগজ কেনা বন্ধ থাকলেও বন্ধ থাকেনি শিক্ষার্থীদের সনদ উত্তোলন। ফলে সময়মতো কাগজ কেনা সম্ভব না হওয়ায় ট্রান্সক্রিপ্ট প্রদান সীমিত করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর। অত্যন্ত জরুরী প্রয়োজন ব্যতীত দীর্ঘদিন ধরেই অনেক শিক্ষার্থী ট্রান্সক্রিপ্ট তুলতে পারছিলেন না। কিন্তু সপ্তাহখানেক ধরে সেই জরুরি প্রয়োজনে ট্রান্সক্রিপ্ট প্রিন্ট দেওয়ার মতো কাগজও ফুরিয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
আইন বিভাগের ফজলে রাব্বি রিমন বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সনদ ও নম্বরপত্র উত্তোলন এক আতঙ্কের নাম। পরিশোধিত ফি এন্ট্রি না হওয়া, কারিগরি ও সফটওয়্যার জনিত জটিলতা, তথ্যগত ভুল যেন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতার দোহাই দিয়ে কেনা হচ্ছে না ট্রান্সক্রিপ্ট প্রিন্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজও। প্রশাসনের ব্যর্থতার জন্য শিক্ষার্থীদের হারাতে হচ্ছে জীবনের মূল্যবান সময় ও চাকরির সুযোগ। এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়?
গনিত বিভাগের তানভীর হীরক বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্মসাল, হলের নাম, মা বাবার নাম ভুল থাকলে সংশোধনের পরেও দায়িত্বরতদের অবহেলায় এগুলো ঠিক হয় না। ফলে সনদপত্র তুলতে হয়রানি হতে হয়। এখন আবার প্রিন্ট করার কালি বা কাগজ নাই। এসব বলতে গেলে ট্রেজারার বা প্রো-ভিসির কাছে পাঠায়। তাদের কাছে গেলে জানায় এসব দায়িত্বে তারা নাই। এভাবে এই টেবিল, ঐ টেবিল করে আমাদের শুধু ঘুরায়। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সক্রিপ্ট প্রিন্টের কাগজ থাকবে না, এটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায়না। আমরা ৪১৫ টাকা ফি দেই ট্রান্সক্রিপ্টের জন্য, প্রশাসনের টাকা মা থাকলেও ফি-এর টাকায় ই কিনে ফেলা যায়।
এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. ওয়ালিউর রহমান পিকুল বলেন, গত নভেম্বরে আমরা কাগজ কেনার চাহিদা দিয়েছি, এখনো অনুমোদন না আসায় আমরা কিনতে পারিনি। সাধারণত আমরা চাহিদা দিলে তা ট্রেজারার স্যারের মাধ্যম হয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়, তারপর ক্রয় কমিটির মাধ্যমে আমরা কিনি। কিন্তু এবার সরাসরি অনুমোদন না দিয়ে একটা কমিটি করা হয়েছে, যে কমিটি এখনো রিপোর্ট দিতে পারিনি। কন্ট্রোলার হিসেবে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির দায়ভার অবশ্যই আমার। আমি একাধিকবার প্রশাসনকে সংকটের ব্যাপারে জানিয়েছিলাম। কিন্তু কমিটির সদস্যরা বসতে না পারায় এমনটা হয়েছে। আশাকরি আগামী সপ্তাহ থেকে আমরা ট্রান্সক্রিপ্ট দিতে পারবো।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ৫০ হাজারের নীচে কাগজ কিনতে হলে ক্রয় কমিটির অনুমোদনে হয়ে যায়। কিন্তু আমি চাচ্ছি একটু বড় পরিসরে কিনতে কেননা এই কাগজ অল্প কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যায়। তো এবারে একবারে বেশি পরিমাণ কাগজ কেনার জন্য একটা কমিটি করা হয়েছে, এজন্য মনে হয় একটু দেরি হচ্ছে। ৫০ হাজারের নিচে হলে আমি চাইলেই সাথে সাথে দিয়ে দিতে পারি। আর যদি এর থেকে বেশি পরিমাণে কিনতে পারি, তবে বারবার কেনার ঝামেলাটা থাকবে না। তবে জরুরী ভিত্তিতে কাগজ অর্ডার দেওয়া হয়েছে, দ্রুতই সংকট কেটে যাবে।
কেকে/ এমএস