বগুড়ায় লাল মরিচ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে চলতি মৌসুমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের কারণে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটলেও সাম্প্রতিক ঝরো বৃষ্টিতে মরিচ শুকানো ও সংরক্ষণ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় রবি ও খরিপ মৌসুম মিলিয়ে মরিচ উৎপাদনের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। কাঁচা মরিচের বিক্রি যুক্ত হলে এ অঙ্ক ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
চলতি মৌসুমে জেলায় মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৯১৫ হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৫৫০ হেক্টরে। এসব জমি থেকে উৎপাদিত হয়েছে ১৭ হাজার ৭৯৯ মেট্রিক টন শুকনা মরিচ, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মরিচ উৎপাদন হয় যমুনা নদীঘেঁষা সারিয়াকান্দি উপজেলায়। প্রতিবছর বন্যার পর চরাঞ্চলে জমে থাকা পলি মাটি উর্বর হওয়ায় তুলনামূলক কম খরচে সেখানে মরিচের ভালো ফলন পাওয়া যায়। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই চরাঞ্চল এবং এসব এলাকার অধিকাংশ জমিতেই মরিচের আবাদ করা হয়।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর শুধু সারিয়াকান্দিতেই ৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। এছাড়া সোনাতলা উপজেলা, গাবতলী উপজেলা, ধুনট উপজেলা ও শেরপুর উপজেলার চরাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে মরিচের আবাদ হচ্ছে।
মরিচ চাষ, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে জেলায় প্রায় ৪ লাখ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এর বড় অংশজুড়ে রয়েছেন নারী শ্রমিকরা।
সারিয়াকান্দির চরবাটিয়া গ্রামের কৃষক আবেদ আলী জানান, এবার তিনি দুই বিঘা জমিতে দেশি উফশি জাতের মরিচ আবাদ করেছেন। সেখান থেকে প্রায় ১৮ মণ শুকনা মরিচ পেয়েছেন। প্রতি মণ ৮ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন তিনি। তার ভাষ্য, প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও ফলন ভালো হওয়ায় লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী হযরত আলী বলেন, “কাঁচা মরিচ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলেও শুকনা মরিচ বড় বড় কোম্পানির পরিবেশকরা কিনে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করে থাকেন।’’
সারিয়াকান্দির হাট ফুলবাড়ী এলাকার বিভিন্ন চাতালে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে শুকাতে দেওয়া হয়েছে লাল মরিচ। নারী শ্রমিকরা মরিচ বাছাই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
শ্রমিক আবেদা বেগম বলেন, “স্বামীর আয়ে সংসার ঠিকমতো চলে না। তাই মরিচের মৌসুমে তিনি চাতালে কাজ করতে আসেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করে প্রতিদিন ১৮০ টাকা মজুরি পান।’’
আরেক শ্রমিক তৌহিদুল ইসলাম জানান, মরিচ বিছানো, জড়ো করা ও বস্তাবন্দির কাজ করে তিনি প্রতিদিন ৪০০ টাকা আয় করেন।
চাতাল মালিক ও সারিয়াকান্দি চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, তার চাতালে বর্তমানে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী। গত বছর তিনি ৬০ টন মরিচ কিনলেও এবার প্রায় ২০০ টন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। শুকানোর পর মরিচ বাছাই করে কোম্পানিগুলোর কাছে সরবরাহ করা হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে মানভেদে শুকনা মরিচের দাম প্রতি মণ ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। মৌসুমের শেষ দিকে দাম আরও বাড়তে পারে বলেও আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
স্কয়ার কোম্পানির স্থানীয় পরিবেশক সুমন মিয়া বলেন, “তিন মণ কাঁচা লাল টোপা মরিচ শুকিয়ে এক মণ শুকনা মরিচ পাওয়া যায়। বর্তমানে বাজারে শুকনা মরিচের দাম বেশ ভালো।’’
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামছুদ্দিন ফিরোজ বলেন, “বগুড়ার লাল মরিচের সুনাম দেশজুড়ে রয়েছে। এখানকার মরিচের রঙ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় চাহিদাও বেশি।’’
তিনি জানান, আবাদ কিছুটা কম হলেও ফলন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়েছে। বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে জেলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মরিচ বাণিজ্য হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কেকে/এলএ