চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বাঁশনালিয়া খাল এখন দখল ও দূষণের চাপে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় যে খাল ছিল এলাকার কৃষি, পানি নিষ্কাশন ও জনজীবনের অন্যতম ভরসা, আজ সেটি অনেক জায়গায় ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। খালের বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। এতে ভূজপুর ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের আশঙ্কা বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, কাজিরহাট বাজার এলাকায় খালের দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা।
বাজারের নিত্যদিনের আবর্জনা ফেলা হচ্ছে সরাসরি খালে। কোথাও কোথাও খালের পানি কালচে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অনেক স্থানে খালের প্রকৃত চিহ্নও প্রায় হারিয়ে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কয়েক বছরের মধ্যেই খালটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে।
জানা গেছে, হারুয়ালছড়ি-ভূজপুর সীমান্ত এলাকার নালিরবিল থেকে বাঁশনালিয়া খালের উৎপত্তি। স্থানীয়দের কাছে এটি বাঁশনালিয়া ছড়া নামেও পরিচিত। পশ্চিম আঁধারমানিক, পশ্চিম ভূজপুর, কাজিরহাট বাজার ও আমতলী এলাকা অতিক্রম করে খালটি গিয়ে মিশেছে মৎস প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতে। হারুয়ালছড়ি ও ভূজপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বৃষ্টির ও পাহাড়ি ঢলের পানি এই খাল দিয়েই প্রবাহিত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রায় এক যুগ আগে শ্রমিক দিয়ে খালটি খনন করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো সংস্কার বা পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পলি জমে খাল ভরাট হয়েছে, আর সেই সুযোগে শুরু হয়েছে দখল।
পশ্চিম ভূজপুর এলাকার বাসিন্দা ও গ্রাম পুলিশ সদস্য জাগির হোসেন বলেন, ‘অনেক আগে খালটি খনন হয়েছিল। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ঠিকমতো নামতে পারে না। বর্ষাকালে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, ফসল নষ্ট হয়। খালটি দ্রুত খনন করা দরকার।’
কৃষক মো. ইউনুচ বলেন, ‘এই খালটা আমাদের কৃষির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। খাল খনন হলে কৃষক যেমন উপকৃত হবে, তেমনি বর্ষায় জলাবদ্ধতাও কমে যাবে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম আঁধারমানিক থেকে হালদা নদীতে মিলিত হওয়া পর্যন্ত খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে পশ্চিম ভূজপুর থেকে কাজিরহাট বাজারের পূর্ব পাশ পর্যন্ত অংশে সবচেয়ে বেশি দখল ও দূষণ হয়েছে। শুধু কাজিরহাট বাজার এলাকাতেই খালের ওপর ও দুই পাড়জুড়ে গড়ে উঠেছে ৫০-১০০টি দোকান। বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে খালটি অনেক স্থানে সরু হয়ে গেছে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা পানি স্বাভাবিকভাবে হালদা নদীতে যেতে পারছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণ চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এতে প্রতিবছর বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার ভোগান্তি বাড়ছে। প্রকৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাঁশনালিয়া খাল এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। দ্রুত দখলমুক্ত করে পুনঃখননের উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে শতবর্ষী এই খাল।
ভূজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এএইচএম শাহজাহান চৌধুরী শিপন বলেন, ‘খালটি খননের জন্য বিএডিসিসহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ ও তদবির করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত খননকাজ শুরু হলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে।’
হালদা বিশেষজ্ঞ ও বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘হালদা নদীর এই শাখা খালটি পরিকল্পিতভাবে খননের মাধ্যমে হারানো নাব্যতা ও প্রাকৃতিক রূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি দখল ও দূষণমুক্ত করতে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীতা রয়েছে।’
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘খাল দখল ও দূষণের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ইতিমধ্যে দখল হওয়া অংশগুলো চিহ্নিত করে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খাল রক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।’
কেকে/এমএ