চট্টগ্রাম নগরী থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর। এখানে করে হাজার মানুষের বসতি। তবে পাহাড়ি দুর্গম পথ, অবৈধ দখল, গ্যাস-পানির সংযোগ, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে এ এলাকাটি পরিণত হয়েছে অবৈধ ‘নো-গো জোনে’। যার ফলে অনেকেই এ এলাকাটিকে ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন।
অতিসম্প্রতি গভীর রাতে এক্সকেভেটর ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে যৌথ বাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ফের আলোচনায় এসেছে জঙ্গল সলিমপুর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি— এটি পরিকল্পিত এবং সংঘবদ্ধ হামলা। তবে তথ্য বলছে, এর নেপথ্যে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। বছরের পর বছর এলাকাটিকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে কেটে ফেলা হয় সড়ক ও কালভার্ট। এ ঘটনাটি ঘিরে সোমবার দিবাগত রাতে টইটম্বুর এলাকায় জঙ্গল সালিমপুরের অভিযানের এলাকায় হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্র বলছে— কিছুদিন আগে এক র্যাব সদস্যের নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য র্যাব-পুলিশ অভিযান চালালে তাতে তোলা হাসান বাহিনীর একটি ক্যাম্পে হামলাকারীদের অভিযানে আসামি ৩ জনকে আটক করা হয়। গত রোববার সকালে রাষ্ট্রবিরোধী ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। আর এই রাতেই গভীর অন্ধকারে সন্ত্রাসীরা দল বেঁধে অতর্কিত হামলা করে সেই ক্যাম্পে। এ অবস্থায় ক্যাম্পটি হামলার শিকার হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। র্যাব-৭ অধিনায়ক ও এসপি উভয়েই জানিয়েছেন, সন্ত্রাসীদের ক্যাম্পটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি হতে দেওয়া হবে না। এ ছাড়া যৌথ বাহিনীর অভিযানে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছেন র্যাব-৭। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযানে ৩৫ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। জানা গেছে, গত সোমবার দুপুরে বিষয়টি জানান র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক (সিপিসি-৩) লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাবিবুর রহমান।
তিনি জানান— গত রোববার দিবাগত রাতে উত্তর দিকের প্রায় ৩০০ সন্ত্রাসী অতর্কিতে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার র্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ব্যারিকেড করে দিয়ে এবং বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভেঙে ফেলে। র্যাবের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করে। র্যাব অধিনায়ক বলেন, হামলার সময় জঙ্গল সালিমপুরের দুর্গ গড়ে তোলা হাসান বাহিনী অংশ নেয়। এ সময় ক্যাম্পে থাকা প্রায় ১৫০ র্যাব ও পুলিশ সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। পরে অভিযানে গেলে হামলা বাহিনী এলাকা পরিত্যাগ করে। তিনি আরও বলেন, হামলার ঘটনায় প্রায় ৩০ জন সদস্য রাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেন, সে জন্য ভেতরে চারটি রাস্তা ও কালভার্ট তৈরি করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে এমন ব্যবস্থাও করা হয়েছে, যাতে যানবাহন যেতে না পারে।
তিনি দাবি করেন, হাসান বাহিনী পরিচালিত হচ্ছে ইসমাইলের নেতৃত্বে। তবে অভিযানের একপর্যায়ে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী পালিয়ে যায়। এ ছাড়া হামলাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য আহত হননি বলেও জানান তিনি।
এদিকে জঙ্গল সলিমপুরের মধ্যে ‘রাষ্ট্র হতে দেওয়া হবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। জঙ্গল সলিমপুর ঘুরে গতকাল তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমাদের পিছু হটার সুযোগ নেই। হামলা, রোকন বা যত বড় বাধাই আসুক, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।”
গতকাল সোমবার সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান নিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীদের গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এখানে এমনভাবে গলির এলাকা নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহজে ঢুকতে না পারে। এ কারণে পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা চালানো হয়েছে।”
হামলাকারীরা যেন ক্যাম্প থেকে বের হতে না পারে, সেজন্য আগেই ব্যারিকেড ব্যবহার করা হয়। পাহাড় ঘেরা এলাকায় যৌথ বাহিনীর গাড়ি, টহল যান ও ট্রাক্টরও ভাঙচুর করা হয়।
এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ৯০-৯৫ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে বলে জানান এসপি মাসুদ আলম। তিনি বলেন, “কঠোর প্রতিরোধের কারণে হামলাকারীরা ক্যাম্প দখলে নিতে পারেনি। তবে হামলাকারীরা এক্সকেভেটরের সাহায্যে ক্যাম্পের বিভিন্ন অবকাঠামো ভেঙে ফেলে। রাতে তারা পাহাড়ি এলাকায় সরে যায়।”
জঙ্গল সলিমপুর এলাকার কোটি কোটি টাকার খাসজমি দীর্ঘ সময় স্থানীয় আধিপত্যে থাকায় সেখানে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রায় ৮০ শতাংশ সময়ই সরকারের বাইরে ছিল এ এলাকা।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর সরকারি খাসজমি হিসেবে প্রায় ৩ যুগ ধরে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিভিন্ন সময় সংস্থা পরিবেশ রক্ষার একাধিক সংগঠন এই দখল করে বসবাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে।
প্রায় তিন যুগ ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা দখল করে সন্ত্রাসীরা পাহাড় কেটে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। এসব সন্ত্রাসী দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাহাড় কেটে জঙ্গল সলিমপুরে নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলে এবং অপরাধ কর্মকাণ্ড চালায়। এলাকাটি প্রায় ২০ হাজার বাসিন্দার আবাসস্থল।
স্থানীয়রা জানান, অপরাধী গোষ্ঠীর আস্তানা হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সালিমপুরকে অনেকেই এখনো ‘মগের মুল্লুক’ বলে আখ্যা দেন। কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম হলো মো. ইসমাইলের নেতৃত্বাধীন ইসমাইল গ্রুপ।
র্যাব ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সীতাকুণ্ড আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক এক নেতার সহযোগিতায় ইসমাইল গোষ্ঠী জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আধিপত্য চালিয়ে পুরো এলাকাই নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়।
তিনি বলেন, জঙ্গল সালিমপুরে যৌথবাহিনীর দীর্ঘদিনের অভিযানের ধারাবাহিকতায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক গোলাম হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন সদস্য।
এখন ওই এলাকায় র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য অবস্থান করছেন। অপরাধ দমনে এলাকাজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে যৌথবাহিনীর ক্যাম্প। তবে সাম্প্রতিক হামলায় ক্যাম্পের বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাব কর্মকর্তারা।
কেকে/এলএ