ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; এটি বহু আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং শিক্ষার্থীদের অধিকারের প্রতীক। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তে ডাকসুর ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে প্রশ্নও বেড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ডাকসুর কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে মব সংস্কৃতির নেতৃত্ব দেওয়া এবং ক্যাম্পাসের চেয়ে রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে বেশি সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান ডাকসু কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে?
বর্তমান ডাকসুর ২৫ সদস্যের নেতৃত্ব গত বছর সেপ্টেম্বরে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পায়। সিংহভাগই ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে নির্বাচিত, অথবা ছাত্রশিবির-সমর্থিত। মাত্র একজন সদস্য বামপন্থিদের প্যানেল প্রতিরোধ পরিষদ থেকে নির্বাচিত হন। বর্তমান কমিটি এরই মধ্যে ৮ মাস অতিক্রম করেছে। নিয়মানুযায়ী ডাকসুর মেয়াদ থাকে এক বছর। সেই হিসেবে বর্তমান নেতৃত্বের মেয়াদ আছে আরও কয়েক মাস। ফলে মূল্যায়ন করার জন্য এটিকে যথেষ্ট সময় বলা যায়।
ছাত্র সংসদের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের সমস্যা তুলে ধরা, প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ রাখা এবং ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। ডাকসুর গঠনতন্ত্রেও অনেকটা তাই লেখা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান ডাকসুর নেতৃত্বকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের কিছুদিন পরে জাতীয় নির্বাচন প্রচারণা শুরু হয়। ওই সময় দেখা যায়, ডাকসুর বেশ কয়েকজন নেতা, যারা দীর্ঘসময় ক্যাম্পাসের বাইরে জামায়াতের প্রার্থীদের দলীয় প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচিত ছাত্রনেতাদের প্রধান দায়িত্ব কি শিক্ষার্থীদের প্রতি, নাকি বৃহত্তর দলীয় রাজনীতির প্রতি?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট এখনও প্রকট। হলগুলোতে সিট সংকট, শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার সমস্যা কিংবা শিক্ষার মানোন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ডাকসুর দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়েনি। বরং নেতৃত্বের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তারা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সংকটে সময় দেওয়ার চেয়ে মূল রাজনৈতিক দলের আদর্শিক ও সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করতেই বেশি মনোযোগী। বর্তমান ডাকসু ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান থেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার সম্প্রসারণে পরিণত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে ক্যাম্পাসে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো বা তাদেরকে আদর্শিকভাবে তুলে ধরার ঘটনাকে অনেকে শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন। কারণ, এই বিশ্ববিদ্যালয়ই মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল, যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ছাত্রশিবির কি সত্যিই তাদের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বের হয়ে এসেছে, নাকি কেবল কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে?
তবে সংকট শুধু আদর্শিক নয়, সাংগঠনিকও। বর্তমান ডাকসুর বিরুদ্ধে ‘মব সংস্কৃতি’ প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও জোরালো হয়েছে। এই ডাকসুর কয়েকজন সদস্য বারবার মব তৈরির অভিযোগে অভিযুক্ত। হকার উচ্ছেদের নামে তাণ্ডব চালানো, কান ধরে উঠবস করানো, শিক্ষককে তাড়া করে বেড়ানো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর অভিযোগে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় মুখ এবং শামসুন্নাহার হলের সাবেক সহ-সভাপতি (ভিপি) শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে মব তৈরি করে গ্রেপ্তার করানো হয়। এরপরে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা ক্যাম্পাসে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জায়গা সংকুচিত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রশ্ন উঠেছে, ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো কি অপরাধ? যদি না হয়, তাহলে যাদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি বা মব তৈরির অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয়নি?
বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু পাঠদান নয়; এটি মুক্ত বিতর্ক, মতপ্রকাশ এবং ভিন্নমতের সহাবস্থানের জায়গা। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় মনে হয়েছে, ভিন্নমতকে সহনশীলভাবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। কয়েকজন শিক্ষককে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ হিসেবে উপস্থাপন করে তাড়া করা, ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা—এসব ঘটনা একটি সুস্থ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশের সঙ্গে যায় না। বরং এগুলো ক্যাম্পাসে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই রাজনীতি থেকে দূরে ঠেলে দেয়।
অবশ্য ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্ব এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। কোনো সময় বলেছেন, প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেও বাস্তবসম্মত পরিবর্তন আনা যায়। এই যুক্তিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবিকভাবেই জটিল। কিন্তু সমস্যাটি অন্য জায়গায়—শিক্ষার্থীরা দৃশ্যমান ফল দেখতে চায়। যখন তারা দেখে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ডাকসু নীরব, তখন স্বাভাবিকভাবেই আস্থার সংকট তৈরি হয়। তবে নতুন উপাচার্য আসার পর রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে ফের মব তৈরির অভিযোগ উঠেছে ডাকসুর কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। এই মবের নেতৃত্বদানকারীরাই আবার কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী ও তার মেয়েকে নিয়ে এআই জেনারেটেড নেতিবাচক ছবি পোস্ট করার অভিযোগে ছাত্রদলের কর্মীদের রোষানলে পড়েছিলেন শাহবাগে।
ডাকসুর অনেক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে। ৫ আগস্টের পর তাদের দলীয় পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন মেরুকরণ। একপক্ষ মনে করছে, বর্তমান নেতৃত্ব ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতির পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিচ্ছে। অন্যপক্ষ এটিকে রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু এই বিতর্কের মাঝখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যাগুলোই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এখন ছাত্ররাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তারা মনে করছে, ছাত্রসংগঠনগুলো আর তাদের শিক্ষা, ভবিষ্যৎ বা ক্যারিয়ার নিয়ে কার্যকরভাবে কাজ করছে না। বরং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আদর্শিক সংঘাত এবং সাংগঠনিক আধিপত্যের রাজনীতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অন্য ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোও খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
ডাকসুর বর্তমান বিতর্ক তাই কেবল একটি ছাত্রসংসদকে ঘিরে নয়; এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। তবে শিবিরের নেতৃত্বাধীন বর্তমান ডাকসুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কারণ, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেও তারা শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রভাব ও আদর্শিক সংকীর্ণতার বাইরে বের হতে পারেনি—এমন ধারণাই এখন অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে তৈরি হয়েছে।
একসময় ডাকসু ছিল শিক্ষার্থীদের আশা, প্রতিবাদ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতীক। কিন্তু যদি সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্প্রসারণে পরিণত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের আস্থা আরও কমবে। আর সেই আস্থাহীনতা শুধু ডাকসুর নয়, পুরো ছাত্ররাজনীতির জন্যই একটি গভীর সতর্কবার্তা।
লেখক : রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি অ্যান্ড পার্টনারশিপ (আইপিপিপি), নেপাল
কেকে/এলএ