সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
শিরোনাম: ড. ইউনূসসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন      বিশ্ববাজারে লাফিয়ে বাড়ছে তেলের দাম      সাত সুপার রদবদল, কারা প্রশাসনে স্বস্তি      রাশিয়া পৌঁছেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বৈঠক করবেন সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে      ট্রেনের ছাদে ভ্রমণে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি      ১৬ মাসে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ      অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি বিনিয়োগে বড় পরিকল্পনা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি : বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ নাকি ব্যয়বহুল ঝুঁকি?
হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির সাম্প্রতিক ঘোষণা অনেকের কাছে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে, অস্ত্রের উৎস বৈচিত্র্যময় করবে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। তুরস্কের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, সাঁজোয়া যান, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক কম ব্যয়ে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম পাওয়ার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। তবে এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে—বাংলাদেশ কি সত্যিই তার কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াচ্ছে, নাকি শুধু এক ধরনের নির্ভরতা থেকে আরেক ধরনের নির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সমানভাবে সম্পর্ক রক্ষা করাই ছিল কূটনৈতিক সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি। এ ভারসাম্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু যখন কোনো একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দ্রুত গভীর হতে শুরু করে, তখন তা অনিবার্যভাবেই আন্তর্জাতিক মহলে একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে।

তুরস্ক বর্তমানে শুধু একটি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী দেশ নয়; এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, ককেশাস এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আরও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। সিরিয়া, লিবিয়া, আজারবাইজান-আর্মেনিয়া সংঘাতসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে আঙ্কারা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। ফলে তুরস্কের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা নির্ভরতা তৈরি হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এমন কিছু ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে, যার সঙ্গে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের সরাসরি সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। ছোট ও মধ্যম আকারের রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় অযথা জড়িয়ে পড়া থেকে নিজেদের দূরে রাখা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিরক্ষা ব্যয়ের যৌক্তিকতা। বাংলাদেশ বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান দায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যুব বেকারত্ব এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। এমন বাস্তবতায় শত শত মিলিয়ন ডলার মূল্যের নতুন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত কতটা প্রয়োজনীয় এবং কতটা অগ্রাধিকারযোগ্য—সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। জাতীয় নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিরাপত্তার ধারণা আজ আর শুধু সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

একবিংশ শতাব্দীতে একটি দেশের নিরাপত্তা নির্ভর করে খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। যদি উন্নয়ন ও মানবসম্পদে বিনিয়োগের পরিবর্তে ক্রমাগত সামরিক ব্যয় বাড়তে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা জাতীয় সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘ন্যাটো মানের প্রযুক্তি’ তুলনামূলক কম ব্যয়ে সরবরাহ করার সক্ষমতা। সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল এ দিকটিকেই সহযোগিতার প্রধান সুবিধা হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, অস্ত্র কেনা তুলনামূলক সহজ হলেও তার রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, সফটওয়্যার আপডেট, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভরতা থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন। একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেমের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেলে ভবিষ্যতে বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। ফলে যে সহযোগিতা শুরুতে স্বাধীনতার প্রতীক বলে মনে হয়, সেটিই পরে নতুন ধরনের কৌশলগত নির্ভরতার রূপ নিতে পারে।

এখানে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—এ সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ কি প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ পাচ্ছে, নাকি শুধু প্রস্তুত সরঞ্জাম কিনছে? যদি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি খাত এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ না পায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল সীমিত থাকবে। প্রকৃত কৌশলগত লাভ তখনই সম্ভব, যখন বিদেশি সহযোগিতা দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ তৈরি করবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। জনগণ এখনো জানে না এ সহযোগিতার প্রকৃত পরিধি কী, সম্ভাব্য ব্যয় কত, অর্থায়নের কাঠামো কী, প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত আছে কি না, কিংবা বাংলাদেশি শিল্প খাত এতে কীভাবে অংশগ্রহণ করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে করদাতাদের অর্থ ব্যয় করে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করা হলে তার বিষয়ে সংসদীয় আলোচনা, নীতিগত ব্যাখ্যা এবং জনসম্মুখে জবাবদিহিতা থাকা উচিত। নিরাপত্তার প্রশ্নে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের অবশ্যই একটি শক্তিশালী ও আধুনিক প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রয়োজন। তবে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা মানেই ক্রমাগত অস্ত্র ক্রয় নয়। প্রকৃত শক্তি আসে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি থেকে। সামরিক সক্ষমতা সেই বৃহত্তর জাতীয় শক্তিরই একটি অংশ।

তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা অবশ্যই হতে পারে এবং হওয়া উচিত। তবে সেটি যেন অন্ধ উচ্ছ্বাস বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের বিবেচনায় নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, আর্থিক বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত লাভ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বাধীনতার কঠোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে হয়। অন্যথায় আজ যে সম্পর্ককে ‘কৌশলগত সুযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেটিই আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য নতুন ধরনের নির্ভরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। একটি স্বাধীন ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত অংশীদারত্ব বৃদ্ধি করা, কিন্তু কোনো একক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক, পর্তুগাল

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  তুরস্ক   প্রতিরক্ষা   চুক্তি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close