চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার নানুপুর ইউনিয়নের কিপাইতনগর গ্রামে মোহাম্মদ বাবর আলী রায়হানের (৪২) সকাল শুরু হয় পুকুরপাড়ের ব্যস্ততায়। সূর্যের আলো পানিতে ঝিলমিল করতেই এক পুকুর থেকে আরেক পুকুরে ছুটে যান তিনি। পানির মান, পোনার বৃদ্ধি, খাবারের অবস্থা- সবকিছুই তার নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকে।
একসময় জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন রায়হান। কমার্স বিষয়ে পড়াশোনা শেষে প্রায় ৯ বছর প্রবাসে ভাঙারি ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও তাকে টানত গ্রামের মাটি। সেই টানেই দেশে ফিরে বেছে নেন মাছের পোনা উৎপাদনের মতো সম্ভাবনাময় একটি খাত।
প্রায় এক যুগ আগে মাত্র ৫০০০০-৬০০০০ হাজার টাকা বিনিয়োগে কয়েকটি পুকুর নিয়ে শুরু হয় তার যাত্রা। সময়ের সঙ্গে পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে সেই ছোট উদ্যোগ আজ বড় খামারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তিনটি নিজস্ব ও পাঁচটি লিজ নেওয়া পুকুরসহ মোট আটটি পুকুরে পোনা উৎপাদন করছেন তিনি। এ খাতে তার বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকায়।
রায়হানের খামারে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালি বাউশ, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প ও তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি গত ৩ বছর ধরে তিনি হালদা নদীর রেণু পোনা সংগ্রহ ও উৎপাদনের কাজও করছেন।
হালদার প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত রেণু পোনা দেশের মৎস্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ কাজে তাকে সহায়তা করছে ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ)। সংস্থাটির কর্মকর্তারা নিয়মিত খামারে এসে পানির মান পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দিয়ে থাকেন। উপজেলা মৎস্য অফিস থেকেও নিয়মিত তদারকি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দেওয়া হয়।
মৎস্য খামারী রায়হান জানান, তিনি পোনা উৎপাদনে অর্গানিক পদ্ধতিকে বেশি গুরুত্ব দেন। প্রাকৃতিক খাদ্য ব্যবহারের ফলে রোগবালাই কম হয় এবং সুস্থ ও মানসম্মত পোনা উৎপাদন সম্ভব হয়।
প্রতি বছর তার খামারে দুই থেকে তিন টন পোনা উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকাতেও সরবরাহ করা হয় এসব পোনা। বর্তমানে এ খামার থেকে তার বার্ষিক আয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
রায়হান বলেন, ‘প্রবাস থেকে ফিরে এমন একটি কাজ করতে চেয়েছিলাম, যা নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও উপকারে আসবে। মাছের পোনা উৎপাদন আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে।’
ফটিকছড়ির গ্রামীণ জনপদে রায়হানের এই উদ্যোগ এখন অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা। বিদেশফেরত একজন মানুষের হাতে গড়ে ওঠা পোনা খামার শুধু তার জীবিকার উৎস নয়, স্থানীয় মৎস্য খাতের উন্নয়নেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। দীর্ঘ এক যুগের শ্রম, ধৈর্য ও স্বপ্নের প্রতিফলন আজ দেখা যায় তার আটটি পুকুরের স্বচ্ছ জলে বেড়ে ওঠা হাজারো মাছের পোনায়।
উপজেলা মৎস্য অফিসার মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘রায়হান বাবর একজন উদ্যমী ও পরিশ্রমী মাছ চাষি। তিনি গত দুই বছর ধরে হালদা নদী থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক রেণু ব্যবহার করে পোনা উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ কার্যক্রমের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি উপজেলা মৎস্য দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেছেন এবং কারিগরি পরামর্শ নিয়েছেন। তার এই উদ্যোগ স্থানীয় মৎস্য খাতের উন্নয়ন এবং হালদার প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।’
কেকে/এমএ