আজ ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপিত হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, দীর্ঘ অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে এ বাজেট নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। তাই এবারের বাজেটকে হতে হবে বাস্তবসম্মত, কল্যাণমুখী এবং সর্বোপরি জনবান্ধব, একইসঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক।
দেশের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আজ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে ওষুধ পর্যন্ত প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার মতো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের সুরক্ষায় টিসিবি ও ওএমএস কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও এসব কার্যক্রম পৌঁছে দিতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বৃদ্ধি করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। অর্থনীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকিং চ্যানেলকে আরও আকর্ষণীয় করতে হবে এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বৃদ্ধি ও প্রবাসীবান্ধব নীতি গ্রহণ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে কৃষিখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা আবশ্যক।
তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি নতুন সরকারের অন্যতম বড় দায়িত্ব। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, স্টার্টআপ উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি জেলায় দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তরুণদের কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত কোনো ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অথচ বাংলাদেশে এখনো এ দুই খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া উচিত। করনীতিতেও প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে করজালের বাইরে থাকা উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কর আদায়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং কর ব্যবস্থায় সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে শুধু বড় বড় ঘোষণা দিয়ে জনবান্ধব বাজেট নিশ্চিত করা যায় না।
সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো বাজেটই কাক্সিক্ষত ফল দিতে পারে না। উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতি রোধে কঠোর নজরদারি, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা এবং সরকারি ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ অপরিহার্য। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের দিকেও মনোযোগী হতে হবে।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট যেন শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বাস্তব প্রতিশ্রুতি বহন করবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার যদি এবারের বাজেটে প্রতিফলিত হয়, তবে সেটিই হবে একটি সত্যিকারের জনবান্ধব বাজেট। দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার এটাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
কেকে/ এমএস