প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট হলো ২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট। এই বাজেট পাস হলে হবে দেশের ৫৫তম বাজেট। বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর বাজেটে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতের ব্যয় মেটাতে বাজেটের ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ১.১৬ লাখ কোটি টাকা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১.৩৫ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
বৈদেশিক ঋণের এই লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৪ শতাংশ বেশি এবং হাসিনা সরকারের পতনের আগের সর্বশেষ বাজেটে প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার চেয়ে ৬৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে ১.০১ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি না ফেরার পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী বাজেট সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ার কারণে, সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এর মধ্যে গত মে মাস শেষে বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়া গেছে মাত্র ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ১.২০ লাখ কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে পারে সরকার।
বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬%)। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বিগত পাচ বছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায় , ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৪.৬%)। ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটের বিপরীতে রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি বাজেটের প্রধান সুবিধা হলো- মন্দা মোকাবেলায় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করে।
বাজেট ঘাটতির ক্ষতিকর দিকগুলো হলো :
১. সরকার যখন ঘাটতি মেটাতে নতুন মুদ্রা ছাপায় বা অতিরিক্ত ঋণ করে, তখন বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ে। কিন্তু সেই অনুপাতে পণ্য ও সেবার উৎপাদন না বাড়লে দ্রব্যমূল্যের দাম হু হু করে বেড়ে যায়।
২. ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারকে ব্যাংক বা বিদেশ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ করতে হয়। এই ঋণের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ সুদ পরিশোধ করতে হয়, যা উন্নয়নমূলক কাজের বরাদ্দ কমিয়ে দেয়। এছাড়া, সরকারের উচ্চমাত্রার ঋণের কারণে বাজারে সুদের হার বৃদ্ধি পায়।
৩. সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের পরিমাণ কমে যায়। ব্যবসায়ীরা বেশি সুদে ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হন, ফলে সার্বিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়।
৪. দীর্ঘস্থায়ী ও বড় আকারের বাজেট ঘাটতি দেশের মোট জাতীয় ঋণ বাড়িয়ে তোলে। এই বিশাল ঋণের দায়ভার ও সুদ পরিশোধের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর গিয়ে পড়ে।
৫. ঘাটতি পূরণে যদি বিদেশি ঋণ বা সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হয়, তবে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বাইরের হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হয়। ৬. ক্রমাগত ঘাটতি থাকলে মন্দা বা জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের নতুন করে প্রণোদনা দেওয়ার বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। তবে উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে নির্দিষ্ট মাত্রায় ঘাটতি বাজেট রাখা একটি পরিচিত কৌশল। তবে তা মাত্রাতিরিক্ত হলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট :- বাংলাদেশ মূলত বৈদেশিক সহায়তা, ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি পূরণ করে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য কৌশলগতভাবে এই পদ্ধতিটি প্রয়োজনীয় হলেও অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, ঋণের বোঝা বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমানোর মতো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাজেট ঘাটতি পূরণের ভালো মন্দ এর কিছু বিষয় হলো-
১. বিশ্বব্যাংক, এশীয়া উন্নয়ন ব্যাংক (অউই) বা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণ তুলনামূলক সাশ্রয়ী। এতে দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধের সুযোগ থাকে।
২. বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে ও সঠিক প্রকল্পে ব্যবহার নিশ্চিত হলে এটি অত্যন্ত সহায়ক। তবে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করে। ৩. সংকটকালে এটি সরকারের জন্য অর্থায়নের দ্রুততম উৎস।
৪. সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ প্রবাহ সংকুচিত হয়। এটি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করে, যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়।
৫. সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে বা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কিছুটা কমে। তবে সরকার উচ্চ সুদে ঋণ নিলে সরকারের সুদজনিত ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়, যা দিনশেষে সাধারণ করদাতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
৬. কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ যা টাকা ছাপানো, এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ বাড়লে তা মূল্যস্ফীতি উসকে দেয় এবং স্থানীয় মুদ্রা টাকার মান কমিয়ে দেয়, যা পরোক্ষভাবে নিম্নবিত্তের জন্য বোঝার কারণ হয়।
বাংলাদেশ সরকারের মোট দেশি ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকা ($২০,০০০ কোটির বেশি মার্কিন ডলার), যার মধ্যে শুধু বৈদেশিক ঋণই রয়েছে প্রায় ১১৩ বিলিয়ন (১১,৩০০ কোটি) ডলারের বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট দেশি-বিদেশি ঋণের স্থিতি প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ : ২০২৫ সালের শেষের দিকে ও ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৩.৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬০৭ ডলারের কাছাকাছি ওঠানামা করেছে। বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের বিপরীতে বার্ষিক সুদের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের মোট দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, মোট বাজেটের প্রায় প্রতি ১০০ টাকা খরচের মধ্যে প্রায় ১৩ টাকা ৭০ পয়সাই চলে যায় পূর্বে নেওয়া ঋণের সুদ শোধ করতে।
সামগ্রিকভাবে সুদ, ভর্তুকি এবং প্রণোদনা মিলিয়ে মোট বাজেটের প্রায় ২৭.৮৬ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
সুতরাং সরকারের ঘাটতি বাজেট পূরণের কৌশলগত দিকটা পরিবর্তন করতে হবে। দেশজ উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণ করলে এই বিপুল পরিমাণ সুদ বয়ে বেড়াতে হবে না।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস