বিশ্বব্যপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রয়োগ আর নতুন কোনো প্রযুক্তিগত ব্যাপার নয়। এ প্রযুক্তিটির ব্যবহার এখন যে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যৎ পৃথিবী দেখবে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে অনেক কষ্টসাধ্য বা অসাধ্য কাজ সম্পাদন করা যায়, তাও আবার অত্যন্ত নিখুঁত ও সুন্দরভাবে। যাই হোক দেশের সব সেক্টরে যখন এআই-এর প্রয়োগ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে, তখন এ প্রয়োগের ফলাফল, ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিগুলো নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বনির্ভরতার দর্শন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির আলোকে আমাদের বুঝতে হবে যে, প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে গ্রহণ করার পাশাপাশি এর সঙ্গে সংযুক্ত ঝুঁকিগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবস্থাপনা করাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে এটা বললে ভুল হবে না যে, প্রায় দুই দশকের তথ্য প্রযুক্তিগত উপনিবেশবাদ, বিদেশি ভেন্ডর বা ক্রয়নির্ভর একপেশে নীতি সেইসঙ্গে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই এ প্রতিবেদনে আমি এআই প্রয়োগ এবং ব্যবহারের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এর প্রভাব নিয়ে আমার চিন্তাধারা উপস্থাপন করব। উদ্দেশ্য একটিই, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার যেন আমাদের জন্য নতুন কোনো ঝুঁকির উৎস না হয়ে দাঁড়ায়।
যা হোক, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এআই এখন আমাদের দেশে সর্বক্ষেত্রেই ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এ প্রযুক্তিটি যত দ্রুত আসছে, সেটিকে নিয়ন্ত্রণ বা যথোপযোগই ব্যবস্থাপনা তত দ্রুত তৈরি হচ্ছে না। ফলে নতুন নতুন সাইবার হুমকি তৈরি হচ্ছে, অথচ এসব ঠেকানোর মতো যথেষ্ট আইন আমাদের হাতে নেই, যা গতকাল সংসদে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেছেন। আর এআই তৈরিকৃত সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট এবং ফেক নিউজসংক্রান্ত হুমকি সামলানোর জন্য আলাদা কোনো সামাজিক সচেতনতার উদ্যোগ ও এর থেকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থাপনাও এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে প্রযুক্তি খুব দ্রুত মানুষের ব্যবহারে ছড়িয়ে পড়ে আর সেটি হক খারাপ বা ভালো ব্যাপারে। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস এর একটি ২০২৪ সালের গবেষণার মতে, বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে এআই এর মতো প্রযুক্তি দিয়ে ব্যাপক নজরদারি বা সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুরক্ষা এবং গণমানুষের সৃজনশীলতার জায়গাটা হুমকির মুখে পড়ছে। এ হুমকিটি বাংলাদেশের জন্য মোকাবিলা করতে গেলে শুধু কারিগরি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; বরং দরকার সঠিক বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্বের।
যা হোক, ফেক নিউজ সম্পর্কিত এআই ব্যবহারের ঝুঁকির মধ্যে আমরা বলতে পারি যে, আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পরা প্রতারণামূলক বার্তা সহজেই ধরা যেত, কারণ সেগুলোর ভাষা ছিল আড়ষ্ট বা ভুলে ভরা। কিন্তু এখন জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে, নিখুঁত বাংলায় বিশ্বাসযোগ্য ফেক নিউজ তৈরি করতে পারে, ফলে ভুয়া বার্তা আর সহজে চেনা যায় না। প্রতারকরা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মূলত তিনভাবে ক্ষতি করছে। প্রথমত, তারা সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে বার্তা সাজিয়ে গণমানুষের আস্থার জায়গাটায় আঘাত করছে।
দ্বিতীয়ত, কৌশলে প্রশ্ন সাজিয়ে এআই-এর নিরাপত্তা বেড়া ফাঁকি দিয়ে উগ্রবাদী বা স্বৈরাচারী বক্তব্য তৈরি করিয়ে নিচ্ছে। তৃতীয়ত, ফেক নিউজ তৈরি থেকে শুরু করে অনুবাদ, ছড়ানো ও বড় করে তোলা, পুরো কাজটাই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করিয়ে নিচ্ছে, যার লক্ষ্য মানুষকে উগ্র করে তোলা বা আর্থিক প্রতারণা করা সম্ভব হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এআই প্রযুক্তি শুধু অনুবাদ করে না, এটি একই ধরনের চিন্তার মানুষদের একসঙ্গে জড়ো করে তাদের ভুল ধারণাকে আরও পাকাপোক্ত করে তুলতে প্রভাব বিস্তার করে চলছে।
এআই প্রযুক্তি এখন যে কারও কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করতে পারে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের রেকর্ড করা কথা থেকে এআই এমন নকল কণ্ঠ বানাতে পারে, যা শুনে আসল-নকল আলাদা করা কষ্টসাধ্য। যেমন ধরা যাক, প্রতারকরা এ কৌশলে স্বজনের কণ্ঠ নকল করে ফোন দিয়ে বলে, ‘আমি বিপদে পড়েছি, দ্রুত টাকা পাঠাও।’ আতঙ্কিত হয়ে স্বজনরা যাচাই বাছাই না করেই টাকা পাঠিয়ে দেন। বাংলাদেশে যেহেতু বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাই এই ঝুঁকি বর্তমানে এআই ব্যবহারের কারণে আরও মারাত্মকভাবে বেড়ে চলছে। প্রতারকরা এআইচালিত চ্যাটবট দিয়ে গ্রাহকসেবার নকল প্রতিনিধি সেজে ওটিপি বা পিন নম্বর হাতিয়ে নেয়, এবং ভুয়া লোন অ্যাপ বানিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও টাকা চুরি হয়ে যাওয়া এখন অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা।
এআই প্রযুক্তি দিয়ে এখন নিখুঁত, পেশাদার ভাষায় ইমেইল তৈরি করা যায়, ফলে ইমেইলের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা এখন সহজ হয়ে গেছে। যেমন, ই-মেইলের মাধ্যমে প্রতারকরা কোনো প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তা বা বিদেশি ক্রেতা সেজে ভুয়া ইমেইল পাঠিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ অন্য অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেয়ার কারসাজি করে থাকে। ধারণাপ্রসূত হয়ে বলতে পারি যে, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলি ও পোশাক রপ্তানি খাত এ ধরনের হামলার বড় লক্ষ্য হতে পারে, কারণ এখানে নিয়মিত বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক লেনদেন হয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সাইবার হামলার মাধ্যমে বিপুল অর্থ চুরির ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের আর্থিক খাত অপরাধীদের কাছে কতটা আকর্ষণীয় লক্ষ্য (সেই হামলাটি এআইচালিত ছিল না, তবে এটি দেখায় অপরাধীরা কোথায় নজর দেয়)।
এআই প্রযুক্তি এখন এ ধরনের প্রতারণাকে আরও দ্রুত ও বিশ্বাসনির্ভর করে তুলছে। আরেকটি বড় বিপদ হলো ডিপফেক, অর্থাৎ এআই দিয়ে তৈরি নকল ছবি, অডিও বা ভিডিও, যা দেখতে একদম আসলের মতো। বিশ্বজুড়ে এর উদাহরণ আছে; যেমন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ কিয়ার স্টারমারের ভুয়া অডিও ছড়ানো বা টেইলর সুইফটের মতো তারকার বিকৃত ছবি বানানোর ঘটনা। এ ধরনের নকল কনটেন্ট যে কোনো সময় দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়াতে পারে এবং মানুষের মনে এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি করে। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, যখন মানুষ আসল আর নকলের পার্থক্য বুঝতে পারে না, তখন অপরাধীরা এর সুযোগ নেয়, কোনো সত্যি প্রমাণ সামনে এলেও তারা সহজেই বলে দিতে পারে, ‘এটা তো এআই দিয়ে বানানো’।
সম্ভবত এআই-উদ্ভূত সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনটি হলো এই যে, বর্তমান সময়ে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু প্রযুক্তি থেকে সরে গিয়ে মানুষের আস্থা ও বিচারবুদ্ধির দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করতে গুজব ও বিকৃত তথ্য বহুদিন ধরে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেখানে সচেতনতা, যাচাইয়ের অভ্যাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংশয়বোধকে সাইবার প্রতিরক্ষার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। কার্নেগি গবেষণায় উল্লিখিত হয়েছে যে, এআই রাষ্ট্রীয় শক্তিকে খারাপভাবে পরিচালিত করতে পারে, যেখানে প্রোপাগান্ডাই মূল হাতিয়ার। এর পরিণতি গণতান্ত্রিক সংহতির ক্রমাগত ক্ষয়, কারণ রাষ্ট্রের নাগরিক বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টিকারি বিশেষভাবে প্রকৌশলিত কৃত্রিম কনটেন্টের মধ্যে বিতর্কে ডুবে থাকে।
বাংলাদেশে নারী রাজনীতিবিদ ও পরিচিত নারীরা এ হামলার সবচেয়ে বড় শিকার হন। কার্নেগির গবেষণা বলছে, নারীদের বিরুদ্ধে এ অপপ্রচার মূলত তিনভাবে হয়। প্রথমত, সম্মতি ছাড়াই এআই দিয়ে নারীদের আপত্তিকর ছবি বানিয়ে তাদের জনসমক্ষে কথা বলা থেকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। দ্বিতীয়ত, সমাজের প্রচলিত কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে নারী নেত্রীদের সম্মান নষ্ট করা হয়। তৃতীয়ত, সংঘবদ্ধ অনলাইন হয়রানির মাধ্যমে মানসিক চাপ তৈরি করে নারীদের নেতৃত্বের ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক যোগ্য নারী জনজীবন থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।
সাধারণ এআই প্রযুক্তির অ্যাপস এ নিরাপত্তা বেড়া থাকে, যা ক্ষতিকর কাজ আটকায়। কিন্তু অপরাধীরা এখন নিরাপত্তা বেড়া তুলে নেওয়া বিশেষ এআই টুল ব্যবহার করছে, যেগুলো বিনা বাধায় ফিশিং বার্তা ও ক্ষতিকর সফটওয়্যার লিখে দেয়। এর ফলে অল্প দক্ষতার অপরাধীও এখন সহজে বড় হামলা চালাতে পারছে, আগে যা করতে অনেক প্রযুক্তিগত জ্ঞান লাগত। এআই প্রযুক্তি দিয়ে এমন ম্যালওয়্যারও বানানো যায়, যা বারবার নিজের রূপ বদলে অ্যান্টিভাইরাসের চোখ ফাঁকি দিতে পারে।
বাংলাদেশে অতীতে সরকারি ওয়েবসাইট থেকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন নাম, জন্মতারিখ বা জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর, বড় আকারে ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ফাঁস হওয়া তথ্য এআই-এর হাতে পড়লে বিপদ আরও বাড়তে পারে। এআই দ্রুত এসব তথ্য একত্র করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নিখুঁত প্রতারণা সাজাতে পারে। আসল তথ্যের সঙ্গে এআই-নির্মিত ভুয়া তথ্য মিশিয়ে ভুয়া পরিচয় তৈরি করে লোন নেওয়া বা সিম তোলার মতো জালিয়াতিও বেড়ে যেতে পারে স্বর্বত্রই। আরও উদ্বেগের বিষয়, ব্যাংক ও মোবাইল সেবায় এখন মুখ চিনে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ডিপফেক ব্যবহার করে এই যাচাইব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে অন্যের নামে অ্যাকাউন্ট খোলা বা টাকা সরানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এআই দিয়ে হাজার হাজার ভুয়া সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট একসঙ্গে চালানো যায়, যেগুলো একই সময়ে একই গুজব বা বিদ্বেষমূলক বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে মনে করাতে সক্ষম যে, অনেক মানুষ এসব কনটেন্টের মতাদর্শে একমত। যা হোক, অতীতে বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বানোয়াট বা বিকৃত পোস্টকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এআই প্রযুক্তি আসার পর এমন বানোয়াট ছবি বা বার্তা তৈরি করা আরও সহজ, দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।
সবশেষে, বড় একটি হুমকি হলো নজরদারি ও ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ। গবেষকদের মতে, ডিজিটাল সিল্ক রোড নামের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে নজরদারি প্রযুক্তি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে; এটি একদিকে অবকাঠামোর জন্য যন্ত্রপাতি দেয়, আবার একই সঙ্গে ব্যাপক নজরদারির কাঠামোও বসিয়ে দেয়। এর একটি বড় অস্ত্র হলো ডেমোস স্ক্র্যাপিং অর্থাৎ এআই দিয়ে নাগরিকদের অনলাইন কর্মকাণ্ড, যেমন কে কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, কোথায় যাচ্ছে, সবকিছু নিয়মিত বিশ্লেষণ করা। এ তথ্য ব্যবহার করে মানুষের রাজনৈতিক মতামত আগেভাগে অনুমান করা এবং সাজানো প্রচারণা দিয়ে তা প্রভাবিত করা যায়। আরও ভয়ের বিষয়, এ তথ্য কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র আগেভাগেই ভিন্নমত দমন করতে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো এআই ও সাইবার বিষয়ে স্পষ্ট, আধুনিক আইনের অভাব। যখন কোনো বিষয়ে পরিষ্কার আইন থাকে না, তখন এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, আর সেই শূন্যতায় অপরাধ ও হস্তক্ষেপ সহজ হয়ে যায়। প্রথম সমস্যা হলো, ডিপফেক বা নকল কনটেন্টের জন্য আমাদের কোনো স্পষ্ট নিয়ম নেই। যেমন কে দায়ী হবে, ভুয়া কনটেন্টে আলাদা চিহ্ন বা লেবেল লাগানো বাধ্যতামূলক কি না, এসব বিষয়ে কোনো পরিষ্কার বিধান নেই। ফলে কেউ নকল ছবি বা ভিডিও বানিয়ে কারও ক্ষতি করলেও তাকে আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো, এআই প্রযুক্তির মডেল তৈরির তথ্য নিয়ে আইনি অনিশ্চয়তা। বিশ্বজুড়ে এখন আদালতে এ নিয়ে মামলাও চলছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের মামলা, যেখানে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যের লেখা বা ছবি দিয়ে এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া বৈধ কি না। এখন বাংলাদেশ যদি এমন কোনো মডেলের ওপর ভিত্তি করে নিজের সিস্টেম বানায়, যেটি নিয়ে বিদেশে মামলা চলছে, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের রাষ্ট্রও আইনি ও নৈতিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ আজ যে ভিত্তির ওপর সিস্টেম দাঁড়াচ্ছে, কাল সেই ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে এআইসংক্রান্ত হুমকি সামলানোর জন্য আলাদা কোনো সুরক্ষা সেল বা সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভাব। এ অভাবের ফলে বেশ কিছু গুরুতর সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যেমন, কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থা না থাকায় এআইসংক্রান্ত হুমকিগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় না। ফলে কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে, তা আগেভাগে জানার উপায় থাকে না, এবং সমস্যা বড় হয়ে যাওয়ার পরই শুধু আমরা টের পাই।
এআই ব্যবহারে কী কী ক্ষতি, যেমন পক্ষপাত, গোপনীয়তা লঙ্ঘন বা নিরাপত্তা ত্রুটি ঘটছে, তা নথিভুক্ত করার কোনো কেন্দ্রীয় তালিকা বা ডেটাবেস বর্তমান সরকারের হাতে নেই। অথচ এমন একটি ঘটনা তালিকা থাকলে একই ভুল বারবার হওয়া ঠেকানো যেত এবং আগেভাগে সতর্ক হয়ে বড় ক্ষতি এড়ানো সহজ হতো। সঠিকভাবে এআই প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনা করার মতো যথেষ্ট দক্ষ জনশক্তি বর্তমানে আমাদের বড়ই অভাব। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যখন কোনো স্বাধীন সুরক্ষা দেবর মতো প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনা সেল থাকে না, তখন নজরদারি ও ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ বিনা বাধায় বাড়তে পারে যা সরকারের বিভিন্ন কাজে ঝুঁকি আনতে পারে।
আমাদের উচিত হবে এখন থেকেই এআই প্রযুক্তি সম্পর্কিত সমস্ত জাতীয় ঘটনার ডিজিটাল তালিকা তৈরি করা, যেখানে এআইসংক্রান্ত ক্ষতি, পক্ষপাত, গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও নিরাপত্তা ত্রুটি, নথিভুক্ত করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস গড়ে তোলা হবে। এতে করে সরকারের এআই ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা যাবে, যাতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ঝুঁকিগুলো পর্যবেক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা যায়। যা হোক, এর মাধ্যমে একটি স্বাধীন এআই সাইবার সুরক্ষা সেল গঠন করা সম্ভব।
এআই প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগের পাশাপাশি নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করেছে। কণ্ঠ নকল থেকে শুরু করে আর্থিক প্রতারণা, ডিপফেক, ম্যালওয়্যার, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস ও নজরদারি হুমকির তালিকা দিন দিন বড় হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা যত এগোচ্ছি, ততই স্পষ্ট আইন এবং দায়িত্বশীল একটি জরুরি বিষয় হয়ে উঠছে। সঠিক আইন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধান, এই তিনটি জিনিস একসঙ্গে থাকলে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার সঠিক করা সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক এআই প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি, যেখানে দেশীয় সক্ষমতা এবং নাগরিকের মর্যাদা ও ডেটা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বনির্ভরতার আদর্শ এবং ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এ ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনার রূপরেখা গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আজ আমরা এআই প্রযুক্তির ঝুঁকিকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবস্থাপনার কথা ভাবছি এই কারণে যে, একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অন্তত বর্তমান এই সময়ে যখন, এআই প্রযুক্তি জনকল্যাণ ও জাতীয় অগ্রগতির সহযোগী হিসেবে পৃথিবীর অনেক দেশেই গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
লেখক : প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
উপদেষ্টা, ন্যাশনালিস্ট আইসিটি ফোরাম এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য
কেকে/ এমএস